টসিলিজুমাব উধাওকাণ্ডে স্বাস্থ্য ভবনে জমা পড়ল জোড়া তদন্ত রিপোর্ট

by Chhanda Basak

কলকাতা: কলকাতা মেডিকেল কলেজের ইঞ্জেকশন কাণ্ডে তদন্ত কমিটির রিপোর্ট জমা পড়ল স্বাস্থ্য ভবনে। কমিটির দেওয়া রিপোর্টে দোষী প্রমাণিত চিকিৎসক দেবাংশী সাহা। ওই রিপোর্টে স্পষ্ট বলা হয়েছে,  নিয়ম বহির্ভূত ভাবে ২৬ টি টোসিলিজুম্যাব ইঞ্জেকশান নিয়েছিলেন এই চিকিৎসক, যার বাজারমূল্য প্রায় দশ লক্ষ টাকা। কলকাতা মেডিক্যাল সূত্রে খবর, তদন্তে কমিটির রিপোর্টে টসিলিজুমাব ইনজেকশন তোলার ক্ষেত্রে বেনিয়মের উল্লেখ করা হয়েছে।

In tocilizumab injection missing case at medical college hospital investigation committee submits report

সূত্রের খবর, রিপোর্টে বলা হয়েছে, নিয়ম ভেঙে ইনজেকশন নিয়েছিলেন চিকিৎসক দেবাংশী সাহা। মেডিক্যাল অফিসার বা হাউস স্টাফের সাক্ষরে এই ইনজেকশন দেওয়ার কথা নয়। রিপোর্ট অনুযায়ী, ‘প্রয়োজন ছিল আরএমও, সিনিয়র মেডিক্যাল অফিসার, ভিজিটিং ডক্টরের সাক্ষর। এছাড়া, ইনজেকশন নেওয়ার সময়েই কোন রোগীর জন্য নেওয়া হচ্ছে উল্লেখ থাকতে হবে। কি ডোজে দেওয়া হবে টসিলিজুমাব তার উল্লেখ থাকতে হবে আবেদনে।’

রিপোর্টে উল্লেখ, কোনও নিয়মই এক্ষেত্রে মানা হয়নি। দুটি তদন্ত রিপোর্টই স্বাস্থ্য ভবনে পাঠিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতাল সূত্রে খবর, ফেব্রুয়ারিতেই মেডিক্যালের রোগী কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান পদে ইস্তফা দিয়েছেন নির্মল মাজি। এই মর্মে সেই ইস্তফা পত্র চেয়ে পাঠিয়েছে স্বাস্থ্য ভবন। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের ধাক্কায় যখন টালমাটাল গোটা দেশ থেকে রাজ্য, তখনই সামনে আসে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে ১১ লক্ষ টাকার করোনার চিকিৎসার ইনজেকশন গায়েবের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ। খাস কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে করোনা চিকিৎসায় ব্যবহৃত ও বহু মূল্যবান ২৬টি টসিলিজুমাব ইনজেকশন হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর থেকে তা ঘিরেই রাজ্য চিকিৎসা ও রাজনৈতিক মহলে জোর হইচই শুরু হয়।

ঘটনার সূত্রপাত গত মঙ্গলবার। ওইদিন ওয়েস্ট বেঙ্গল কংগ্রেস সাপোর্টার্স নামে একটি ফেসবুক পেজ থেকে একাধিক নথি-সহ সরাসরি চিকিৎসক দেবাংশী সাহার বিরুদ্ধে এই বিস্ফোরক অভিযোগ করা হয়। ঘটনায় নাম জড়ায় তৃণমূল বিধায়ক ও চিকিৎসক নেতা নির্মল মাজির। অভিযুক্ত চিকিৎসক তাঁর ঘনিষ্ঠ বলে দাবি করা হয়। যদিও এর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ মানতে নারাজ নির্মল মাজি। তিনি বলেন, আমি তো আগেই রোগী কল্যাণ সমিতির পদ থেকে পদত্যাগ করি। আমিই তো তদন্ত করতে বলি। আমি দালালচক্রের কথা বলেছিলাম। তাই নাম ফাঁসিয়ে দিয়েছে। তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করব।

ট্রেনের পর এবার খেলার মাঠ ও স্টেডিয়ামগুলিও বিক্রির সিদ্ধান্ত রেলের

এরপরই, টসিলিজুমাব উধাও কাণ্ডে দু’টি তদন্ত কমিটি তৈরি করে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি, কলকাতা মেডিক্যালে টসিলিজুমাব ইনজেকশন উধাও-কাণ্ডে হাইকোর্টে দায়ের হয়েছে জনস্বার্থ মামলা। শুক্রবারই বিষয়টি নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন আইনজীবী তাপস মাইতি। উচ্চ আদালতে মামলা দায়েরের অনুমতি চান। আইনজীবীর আবেদনের প্রেক্ষিতেই এই মামলা দায়ের হয়েছে। সম্ভবত আগামী সপ্তাহে হাইকোর্টে টসিলিজুমাব উধাও সংক্রান্ত মামলার শুনানি হবে।

কি এই টসিলিজুমাব ইনজেকশন?

চিকিৎসকরা বলছেন, টসিলিজুমাব হল ইনটারলিউকিন সিক্স গোত্রের ওষুধ। এটি একটি অ্যান্টিবডি মেডিসিন।

কি কাজে ব্যবহার হয় এটি?

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, মানুষের শরীরে যখন ভাইরাল ইনফেকশন হয়, তখন শরীরের ভিতরে সাইটোকাইন বলে একটি রাসায়নিক তৈরি হয়। আর যখন এই সাইটোকাইনের মাত্রা বেড়ে যায়, তখন শরীরে মধ্যে বিভিন্ন বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে শুরু করে। শরীরে এই অনিয়ন্ত্রিত সাইটোকাইনকেই নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে টসিলিজুমাব ইনজেকশন।

শীতলকুচির সেই বুথের ভিতরেও চলেছিল গুলি! তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য সিআইডির

শুধু তাই নয়, সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, করোনা আক্রান্ত গুরুতর রোগীদের অনেকের ক্ষেত্রেই এই টসিলিজুমাব ইনজেকশন প্রয়োগে ইতিবাচক ফল মিলেছে।

আর তারপর থেকেই করোনাকালে হাহাকার পড়ে গিয়েছে এই ইনজেকশনের। ফুসফুস বিশেষজ্ঞ সুজন বর্ধন বলেন, স্টেরয়েড দেওয়ার পরও সাইটোকাইন নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না, তখন এটা প্রয়োগ করা হয়। আগে পরীক্ষা করে দেখা হয় অন্যান্য ইনফেকশন আছে কি না, কারণ এটা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই ইনজেকশনের দামও অনেকটাই। বর্তমানে একটি ইনজেকশনের দাম ৩৮ হাজার ৪৫০ টাকা। আগে দাম ছিল ৪২ থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে।

ডেল্টা প্রজাতি রুখতে কমাতে হবে টিকাকরণের ব্যবধান, ল্যানসেটের সমীক্ষায় অস্বস্তিতে কেন্দ্র

এই প্রেক্ষাপটে, গত ৩ মে, টসিলিজুমাব ইনজেকশন নিয়ে একটি নির্দেশিকা জারি করে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর। সেই নির্দেশিকা অনুযায়ী, বর্তমানে খোলা বাজারে এই ইঞ্জেকশন পাওয়া যায় না। রাজ্যে একটি মাত্র সংস্থাই টসিলিজুমাব ইনজেকশন সরবরাহ করে।

রাজ্যের নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনও সরকারি হাসপাতালে কোনও রোগীর টসিলিজুমাব ইনজেকশন লাগলে, সেই রোগীর সব নথি স্বাস্থ্যভবনে পাঠাতে হবে। সেখান থেকে নথি যাচাই করে সবুজ সংকেত মিললে, তবেই দেওয়া হয় এই ইনজেকশন।

অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতাল বা নার্সিংহোম এবং ইঞ্জেকশন প্রস্তুতকারী সংস্থার মধ্যে সেতুবন্ধনের কাজও করে রাজ্য সরকার।

Copyright © 2025 NEWS24-BENGALI.COM | All Rights Reserved.

google-news