লিভারে চর্বি জমা আজকাল একটি অত্যন্ত সাধারণ সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অসংখ্য প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, বর্তমানে প্রতি তিনজন মানুষের মধ্যে একজন ফ্যাটি লিভার বা যকৃতে চর্বি জমার সমস্যায় ভুগছেন। মানুষের মনে একটি সাধারণ প্রশ্ন প্রায়ই জাগে—ফ্যাটি লিভার কি সত্যিই নিরাময় বা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব? এই নিবন্ধে আমরা এমন কিছু পরামর্শ বা টিপস তুলে ধরব, যা লিভার থেকে চর্বি কমাতে বা তা পুরোপুরি দূর করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।
একবার ফ্যাটি লিভার দেখা দিলে তা কি পুরোপুরি সারিয়ে তোলা সম্ভব? লিভারে জমে থাকা চর্বি দূর করতে কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত? ইন্টারনেট বা অনলাইনে প্রায়শই এমন সব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়ে থাকে। এই সমস্যার সমাধানের উপায় হিসেবে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত বেশ কিছু ‘রিল’ (ভিডিও ক্লিপ) ইতিমধ্যেই ভাইরাল হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, লিভারের সুস্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনতে আমাদের কি কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত? এছাড়া, কোন কোন নির্দিষ্ট সতর্কতার বিষয়ে আমাদের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন?
গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি বিশেষজ্ঞ ডা. মণীশ কাক-এর মতে, লিভারে জমে থাকা চর্বি অবশ্যই কমানো বা পুরোপুরি দূর করা সম্ভব—তবে শর্ত হলো, সমস্যাটি যেন ‘লিভার ফাইব্রোসিস’ বা যকৃৎ শক্ত হয়ে যাওয়ার পর্যায়ে না পৌঁছে থাকে। যদি ফাইব্রোসিস দেখা দেয়, তবে পরবর্তীতে ‘লিভার সিরোসিস’ হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতি যদি ফাইব্রোসিস পর্যন্ত গড়ায়, তবে অনেক ক্ষেত্রেই শেষমেশ লিভার প্রতিস্থাপন বা ‘লিভার ট্রান্সপ্লান্ট’-এর মতো জটিল চিকিৎসার প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
ডা. মণীশ ব্যাখ্যা করেন যে, সাধারণত ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসার জন্য তিন মাস পর্যন্ত সময়ের প্রয়োজন হতে পারে। এই পুরো সময়টুকুতে খাদ্যাভ্যাস থেকে শুরু করে শরীরচর্চা—সবকিছুর দিকেই অত্যন্ত সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। আপনার যদি মদ্যপানের অভ্যাস থাকে, তবে তা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনা বা বর্জন করা অত্যন্ত জরুরি। প্রতি মাসে অন্তত একবার ‘SGPT’ পরীক্ষা করানো আবশ্যক; কারণ এই পরীক্ষার ফলাফলের মাধ্যমেই বোঝা যায় যে, আপনার লিভারের স্বাস্থ্যের কতটা উন্নতি হচ্ছে।
৫,০০০ থেকে ৭,০০০ কদম হাঁটুন: বিশেষজ্ঞরা একটি সাপ্তাহিক শরীরচর্চা বা ব্যায়ামের পরিকল্পনা তৈরি করার পরামর্শ দেন। এমন একটি রুটিন মেনে চলুন, যার অন্তর্ভুক্ত থাকবে—পাঁচ দিন দ্রুতলয়ে হাঁটা (brisk walking), দুই দিন পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়াম বা ‘স্ট্রেন্থ ট্রেনিং’, এবং প্রতিটি প্রধান খাবারের (যেমন—দুপুরের ও রাতের খাবার) পর অন্তত ১০ মিনিট করে হাঁটা। সকালের হাঁটাকে সবচেয়ে উপকারী বিকল্প হিসেবে গণ্য করা হয়; কারণ সকালের হালকা রোদে শরীর মেলে ধরলে আমরা ‘ভিটামিন ডি’ (Vitamin D) পাই—যা লিভারের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আরও পড়ুন : তেলাপোকা তাড়াবেন কীভাবে? এই ঘরোয়া উপায়গুলো মেনে চলুন।
চিনি হলো “সাদা বিষ”: আজ থেকেই চিনিযুক্ত খাবার খাওয়া বন্ধ করুন। মিষ্টিজাতীয় খাবার, চিনি দিয়ে তৈরি চা এবং অন্যান্য অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, চিনি আমাদের লিভারের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। যদিও চিনি খাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞরা দেন না, তবুও পরিমিত পরিমাণে চিনি সেবন করাই হলো স্বাস্থ্যের জন্য সর্বোত্তম পন্থা। সবুজ শাকসবজি খান—আপনার প্রতিদিনের অন্তত একটি খাবারে পালং শাক, ব্রোকলি, লাউ, ঝিঙে, করলা এবং পটল-এর মতো সবুজ শাকসবজি অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি নিশ্চিত করুন। এই সবুজ শাকসবজিগুলো যকৃতে (লিভারে) সৃষ্ট প্রদাহ কমাতে সহায়তা করে বলে পরিচিত। আপনার দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে যদি সাধারণত রুটি বা বিস্কুটের মতো বেকারি সামগ্রী খাওয়ার প্রবণতা থাকে, তবে সেগুলোর সেবন কমিয়ে ফেলা উচিত।
প্রোটিনের সেরা উৎসসমূহ—যাদের ‘ফ্যাটি লিভার’ বা যকৃতে চর্বি জমার সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ এটি যকৃতের পুনরুদ্ধার ও স্বাভাবিক কার্যসম্পাদনে সহায়তা করে। নিরামিষাশী প্রোটিনের উৎস হিসেবে মুগ ডাল, ছোলা, রাজমা (কিডনি বিনস), অঙ্কুরিত শস্য (sprouts), পনির অথবা টোফু জাতীয় খাবার গ্রহণ করুন। আমিষাশী বিকল্প হিসেবে ডিম, গ্রিল করা মুরগির মাংস এবং মাছ বেছে নিতে পারেন। ছাগলের মাংসও একটি উপকারী খাদ্যবিকল্প, কারণ এটি ভিটামিন B12 সরবরাহ করে—যা যকৃতের স্বাস্থ্যের উন্নতিতে সহায়তা করে বলে পরিচিত একটি পুষ্টি উপাদান।