চোখের নিচের কালো দাগ—যার চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় নাম ‘পেরিয়রবিটাল হাইপারপিগমেন্টেশন’ (POH)—এর ফলে চোখের চারপাশের ত্বক কালচে-বাদামী বর্ণ ধারণ করে। কারো কারো ক্ষেত্রে ত্বকের এই বর্ণ বেগুনি বা নীলচেও দেখায়। যদিও যেকোনো বয়সের মানুষেরই চোখের নিচে কালো দাগ পড়তে পারে, তবুও নির্দিষ্ট কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এর প্রবণতা বা ঝুঁকি কিছুটা বেশি থাকে। উদাহরণস্বরূপ, এটি বংশগত বা জিনগত হতে পারে; আপনার বাবা-মায়ের কারো যদি এই সমস্যা থেকে থাকে—হয়তো জন্মগতভাবেই তাদের ত্বক পাতলা হওয়ার কারণে—তবে আপনার মধ্যেও এই সমস্যা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা বা ঝুঁকি থাকতে পারে। জিনগত কারণ ছাড়াও আরও অনেক বিষয় রয়েছে যা চোখের নিচে কালো দাগ সৃষ্টির জন্য দায়ী হতে পারে। এই দাগ দূর করতে বিভিন্ন ঘরোয়া টোটকা বেশ কার্যকর প্রমাণিত হতে পারে; তাছাড়া বর্তমানে বাজারে চোখের নিচের ত্বকের জন্য তৈরি নানা ধরণের উন্নতমানের সিরাম ও ক্রিমও সহজলভ্য। তবে মনে রাখবেন, এই চিকিৎসাগুলো তখনই সুফল দেবে, যখন আপনি একইসাথে আপনার জীবনযাত্রায়ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনবেন।
চোখের নিচের কালো দাগ বলতে মূলত চোখের পাতা এবং চোখের ঠিক নিচের অংশের ত্বকের কালচে হয়ে যাওয়া বা রঞ্জক পদার্থের আধিক্যকেই বোঝায়। কারো কারো ক্ষেত্রে চোখের নিচে একটি গর্ত বা খাঁজ তৈরি হয়; এর ফলে সেখানে এক ধরণের ছায়ার সৃষ্টি হয়, যা দেখে প্রায়শই মনে হয় যেন চোখের নিচে কালো দাগ পড়েছে। কারো কারো ক্ষেত্রে বার্ধক্যজনিত প্রক্রিয়ার একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই এই কালো দাগগুলো দেখা দেয়, আবার অন্যদের ক্ষেত্রে অনেক কম বয়সেই এই সমস্যা শুরু হতে পারে। চোখের নিচের কালো দাগ কার্যকরভাবে দূর করার জন্য যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আপনার মনে রাখা প্রয়োজন, চলুন সেগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।
আপনার ঘুমের অভ্যাস উন্নত করুন
আপনি যদি চোখের নিচের কালো দাগের সমস্যায় ভুগে থাকেন, তবে আপনি যেসব বাহ্যিক চিকিৎসা বা প্রসাধনী ব্যবহার করছেন, সেগুলোর পাশাপাশি আপনার শরীরের অভ্যন্তরীণ জৈবিক চক্র বা ‘বায়োলজিক্যাল সাইকেল’-এর দিকেও নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। আর এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমানো বা বিশ্রাম নেওয়াটা অপরিহার্য। আপনার যদি গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকার অভ্যাস থাকে, তবে সচেতনভাবে সেই অভ্যাসটি পরিবর্তন করার চেষ্টা করুন। আপনার লক্ষ্য হওয়া উচিত রাত ১০টার মধ্যে (সর্বোচ্চ সময়সীমা) ঘুমিয়ে পড়া এবং প্রতি রাতে যেন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা পর্যাপ্ত ঘুম হয়, তা নিশ্চিত করা। এটি আপনার মানসিক চাপ বা স্ট্রেস কমাতেও সহায়তা করবে। বস্তুত, চোখের নিচে কালি পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো মানসিক চাপ।
স্ক্রিন ব্যবহারের সময় কমিয়ে আনুন
চোখের নিচে কালি পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ফোন বা যেকোনো ধরণের স্ক্রিনের সামনে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করা। আপনিও কি দীর্ঘ সময় ধরে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকেন? এই অভ্যাসটি কমিয়ে আনার চেষ্টা করুন। যদি আপনার কাজের প্রয়োজনে স্ক্রিনের সামনে থাকতেই হয়, তবে ঘুমানোর অন্তত দুই ঘণ্টা আগে ফোনটি সরিয়ে রাখার বা ব্যবহার বন্ধ করার ব্যাপারে সচেতন প্রচেষ্টা চালান। অন্ধকারে স্ক্রিনের দিকে তাকানো থেকে বিরত থাকুন এবং টেলিভিশন দেখার সময়সীমা কমিয়ে আনুন। এছাড়া, সন্ধ্যায় আপনার চোখকে কিছুটা বিশ্রাম দিন—উদাহরণস্বরূপ, চোখের ওপর ঠান্ডা সেঁক দিয়ে কিংবা শসার টুকরো রেখে।
খাদ্যাভ্যাসের উন্নতি ঘটান
অনেক সময় চোখের নিচে কালি পড়া শরীরের পুষ্টিহীনতারই একটি লক্ষণ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে, আপনার খাদ্যাভ্যাসের উন্নতির দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত। আপনি একজন পুষ্টিবিদের (Nutritionist) পরামর্শ নিতে পারেন, যিনি আপনার শারীরিক অবস্থা যাচাই করে একটি ব্যক্তিগত ডায়েট প্ল্যান বা খাদ্যতালিকা তৈরি করে দেবেন; বিকল্প হিসেবে, আপনি অস্বাস্থ্যকর খাবারগুলো বাদ দিয়ে আপনার খাদ্যতালিকায় মৌসুমি শাকসবজি, ফলমূল, বিভিন্ন ধরণের বীজ, বাদাম, পূর্ণ শস্যদানা এবং শুকনো ফল (ড্রাই ফ্রুটস) অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন।
আরও পড়ুন : দিন না রাত… ভিটামিন সি সিরাম ব্যবহারের সঠিক সময় কোনটি? জানুন বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে
শরীরে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা বজায় রাখুন
শরীরে পর্যাপ্ত আর্দ্রতার অভাবও চোখের নিচে কালি পড়ার একটি কারণ হতে পারে। শরীরের আর্দ্রতা বজায় রাখার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করা এবং স্বাস্থ্যকর পানীয় গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি—যেমন: ডাবের জল, লেবুজল, ঘোল (বাটারমিল্ক) ইত্যাদি। এছাড়া, চোখের নিচের ত্বককেও আর্দ্র বা সতেজ রাখা প্রয়োজন; আপনি চোখের নিচের অংশে কয়েক মিনিটের জন্য কোনো ভালো মানের তেল দিয়ে আলতোভাবে মালিশ করার মাধ্যমে এটি করতে পারেন।
অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলো পরিবর্তন করুন
চোখের নিচে কালি পড়া থেকে শুরু করে ঠোঁট ও ত্বকের বিভিন্ন ধরণের দাগ বা পিগমেন্টেশনের সমস্যা পর্যন্ত—এমন অনেক শারীরিক সমস্যার মূলে রয়েছে আমাদের কিছু অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অতিরিক্ত মদ্যপান এবং ধূমপান। আপনার যদি এমন কোনো ক্ষতিকর অভ্যাস থেকে থাকে, তবে তা পরিবর্তনের জন্য অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। এমনটা করলে তা কেবল আপনার ত্বকের অবস্থারই উন্নতি ঘটাবে না, বরং আপনার সামগ্রিক স্বাস্থ্যেরও প্রভূত উন্নতি সাধন করবে।