শরীরে অতিরিক্ত ওজন কিংবা পেটের মেদ (ভুঁড়ি) একজন মানুষের সামগ্রিক সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্ব নষ্ট করে দিতে পারে। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসই মূলত এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করে। এছাড়া, অনেকেরই শারীরিক ফিটনেসের অভাব থাকে, যার ফলে ধীরে ধীরে ওজন বাড়তে থাকে। বর্তমান আধুনিক বিশ্বে, ওজন কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নানা ধরনের পদ্ধতির খোঁজ চলছে। গ্রিন টি পান করা তেমনই একটি পদ্ধতি। সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে এমন অসংখ্য ভাইরাল রিল ও ভিডিও ছড়িয়ে আছে, যেখানে দাবি করা হয় যে—গ্রিন টি পান করলে খুব দ্রুত ওজন কমে। এই ভিডিওগুলোর অনেকটিতেই গ্রিন টি পান করার উপযুক্ত সময় নিয়েও পরামর্শ দেওয়া হয়; কেউ কেউ মনে করেন, সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরপরই খালি পেটে এটি পান করা সবচেয়ে ভালো—আবার অন্যদের মতে, রাতে ঘুমানোর আগে পানীয় হিসেবে এটি সবচেয়ে বেশি কার্যকর। গ্রিন টি সংক্রান্ত এই ধরনের ভুল ধারণা ও বিভ্রান্তিগুলো সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত।
আপনিও কি গ্রিন টি পান করার সেরা সময়টি নিয়ে বিভ্রান্তিতে ভুগছেন? আপনার এই উদ্বেগটি সম্পূর্ণ যৌক্তিক; কারণ ভুল সময়ে কিংবা ভুল পদ্ধতিতে গ্রিন টি পান করলে তা উপকারের বদলে উল্টো শরীরের ক্ষতিই করতে পারে। এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছে বিশিষ্ট পুষ্টিবিদ (Senior Dietitian) গীতিকা চোপড়ার। চলুন জেনে নেওয়া যাক, তিনি এ বিষয়ে কি পরামর্শ দিয়েছেন…
গ্রিন টি-এর উপাদানসমূহ | গ্রিন টি-এর পুষ্টিগুণ
গ্রিন টি—যা সাধারণত ওজন কমানো বা শরীরের মেদ ঝরানোর উদ্দেশ্যে পান করা হয়—তা কেবল একটি সাধারণ পানীয়ই নয়; বরং এটি অসংখ্য উপকারী উপাদানে পরিপূর্ণ। এতে এমন সব পুষ্টি উপাদান বিদ্যমান, যা শরীরের জন্য নানাবিধ সুফল বয়ে আনে—যার মধ্যে অন্যতম হলো ওজন কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা। এক কাপ (প্রায় ২৪০ মিলি) গ্রিন টি পান করলে তা কেবল শরীরের পানির ভারসাম্যই বজায় রাখে না, বরং শরীরকে বেশ কিছু অত্যাবশ্যকীয় পুষ্টি উপাদানও সরবরাহ করে। এতে বিভিন্ন পরিমাণে ভিটামিন সি, ভিটামিন B2 এবং ফোলেট (ভিটামিন B9) থাকে। ভিটামিন সি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে; ভিটামিন B2 শরীরের শক্তির মাত্রা বৃদ্ধি করে; এবং ভিটামিন B9 শরীরের কোষগুলোর সুষ্ঠু কার্যকারিতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। গ্রিন টি-তে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম থাকে, যা শরীরের তরল বা জলের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া, এতে প্রচুর পরিমাণে ম্যাগনেসিয়াম এবং ম্যাঙ্গানিজও বিদ্যমান। গ্রিন টি-এর আরেকটি প্রধান উপকারিতা হলো এতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যার মধ্যে ক্যাটেচিন এবং পলিফেনলের মতো যৌগগুলো উল্লেখযোগ্য। চলুন, একজন বিশেষজ্ঞের সহায়তায় জেনে নেওয়া যাক—গ্রিন টি পান করার আদর্শ সময় কোনটি।
গ্রিন টি পান করার সেরা সময় কোনটি?
সিনিয়র ডায়েটিশিয়ান গীতিকা চোপড়া উল্লেখ করেন যে, অনেকেই গ্রিন টি-কে ওজন কমানোর একটি সহজ বা ‘শর্টকাট’ উপায় হিসেবে ভুল করে থাকেন। তবে এটি কেবল একটি “চর্বি-পোড়ানোর” পানীয় নয়; বরং এটি শরীরের বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজম বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। এতে ক্যাটেচিন এবং সামান্য পরিমাণে ক্যাফেইন থাকে, যা চর্বি জারণ (fat oxidation) বৃদ্ধি করতে এবং বিপাকের হার বাড়াতে সাহায্য করে। তবুও, গ্রিন টি পান করার পাশাপাশি একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাপন বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।
ওই বিশেষজ্ঞ আরও ব্যাখ্যা করেন যে, যদি ভুল সময়ে গ্রিন টি পান করা হয়, তবে তা উপকারিতার পরিবর্তে ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। এটি খালি পেটে পান করা উচিত নয়; কারণ এতে অ্যাসিডিটি, বমি বমি ভাব বা পেটের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। গ্রিন টি পান করার সর্বোত্তম সময় হলো সকালের নাস্তার প্রায় ৩৫ মিনিট পর। বিকল্প হিসেবে, দুপুরের খাবারের পরেও এটি পান করা যেতে পারে। এই অভ্যাসটি হজমে সহায়তা করে এবং খাবারের পর রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া (blood sugar spikes) নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
আরও পড়ুন : পেটের সুস্বাস্থ্য, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বৃদ্ধি করতে প্রতিদিন খান এই ছোট্ট জিনিসটি
গীতিকা চোপড়া আরও জানান যে, শরীরচর্চা বা ‘ওয়ার্কআউট’-এর আগেও আপনি গ্রিন টি পান করতে পারেন, কারণ এটি শরীরে বাড়তি শক্তি বা উদ্দীপনা জোগায়। তবে, যাদের শারীরিক সংবেদনশীলতা বা পেটের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এতে অ্যাসিডিটি দেখা দিতে পারে। তিনি সকালে খালি পেটে এটি পান না করার পরামর্শ দেন এবং রাতে ঘুমানোর ঠিক আগে এটি পান করার ব্যাপারে কঠোরভাবে সতর্ক করেন। এর কারণ হলো, গ্রিন টি-তে থাকা ক্যাফেইন ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
দিনে কত কাপ গ্রিন টি পান করা উপযুক্ত?
ওই বিশেষজ্ঞ পরামর্শ দেন যে, প্রতিদিন আপনি কতটুকু গ্রিন টি পান করছেন, তার ওপর নজর রাখা উচিত। দিনে ২ থেকে ৩ কাপ গ্রিন টি পান করাকে উপযুক্ত বা সহনীয় মাত্রা হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে, অতিরিক্ত পরিমাণে পান করলে শরীরে জলশূন্যতা (dehydration), আয়রনের ঘাটতি বা অ্যাসিডিটির সমস্যা দেখা দিতে পারে। গ্রিন টি তখনই কার্যকর ভূমিকা রাখে, যখন আপনার খাদ্যাভ্যাস, ঘুম এবং শারীরিক কার্যকলাপ—সবকিছুই একটি সুশৃঙ্খল নিয়মের মধ্যে থাকে। গ্রিন টি-এর মতো বিষয়গুলো হলো সহায়ক উপকরণ মাত্র; এগুলো কোনো জাদুকরী সমাধান নয়।