হাড়ের ব্যথায় বা ‘কটকট’ শব্দে ভুগছেন? এই পরীক্ষাগুলো অবশ্যই করিয়ে নিন

অনেকেই প্রায়শই হাড়ের ব্যথা থেকে শুরু করে নড়াচড়ার সময় হাড়ের ভেতর থেকে এক ধরণের স্পষ্ট 'কটকট' বা 'মটমট' শব্দ হওয়ার সমস্যায় ভোগেন। এই লক্ষণগুলোকে উপেক্ষা করা বোকামি, কারণ এগুলো কোনো গুরুতর অভ্যন্তরীণ শারীরিক সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। তাই, সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। চলুন, বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।

5 Min Read

অনেক মানুষই শারীরিক নড়াচড়ার সময় হাড়ের ব্যথা এবং হাড় থেকে শব্দ হওয়ার অভিযোগ করেন। যদিও বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই সমস্যাটি বেশি দেখা দিতে পারে, তবুও বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও এর প্রকোপ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে; যেমন—ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘ডি’-এর অভাব, হাড়ের জোড়া বা জয়েন্টগুলোর ক্ষয়, বসার বা দাঁড়ানোর ভুল ভঙ্গি (poor posture), কাজের প্রয়োজনে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকা, অথবা সাধারণভাবে শারীরিক পরিশ্রম বা ব্যায়ামের অভাব।

নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যারা অফিসের পরিবেশে দীর্ঘ সময় বসে কাজ করেন—তাদের ক্ষেত্রে এই সমস্যার ঝুঁকি বিশেষভাবে বেশি। যদি সঠিক সময়ে এই সমস্যার সমাধান না করা হয়, তবে ভবিষ্যতে এটি হাড়-সংক্রান্ত কোনো গুরুতর ব্যাধিতে রূপ নিতে পারে। তাই, সমস্যার মূল কারণটি শনাক্ত করতে এবং সঠিক চিকিৎসা শুরু করতে, সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো অপরিহার্য। আসুন জেনে নিই হাড়-সংক্রান্ত সমস্যার নির্দিষ্ট লক্ষণগুলো কি কি এবং এই ক্ষেত্রে কোন কোন পরীক্ষাগুলো করানো উচিত।

হাড়-সংক্রান্ত সমস্যার এই লক্ষণগুলোকে উপেক্ষা করবেন না

হাড়ের সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার কিছু নির্দিষ্ট সতর্কবার্তা বা লক্ষণ রয়েছে, যা কখনোই উপেক্ষা করা উচিত নয়—যেমন: একটানা বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা, হাঁটাচলায় বা নড়াচড়ায় অসুবিধা, অথবা হাড়ের জোড়া বা জয়েন্টগুলোতে আড়ষ্টতা বা শক্ত হয়ে যাওয়ার অনুভূতি। অনেক সময়, বসা থেকে ওঠার সময় কিংবা বসার মুহূর্তে হাড়ের ভেতর থেকে স্পষ্ট ‘কটকট’ বা ‘মটমট’ শব্দ হওয়াও একটি সতর্কবার্তা হিসেবে গণ্য হতে পারে।

যদি আপনি সাধারণ শারীরিক দুর্বলতা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, অথবা সামান্য আঘাত পেলেও অস্বাভাবিকভাবে তীব্র ব্যথা অনুভব করেন—তবে এই লক্ষণগুলো হাড়ের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার ইঙ্গিত হতে পারে। এছাড়া, শরীরের কোনো নির্দিষ্ট অংশে ফুলে যাওয়া বা একটানা অস্বস্তি অনুভব করাও উদ্বেগের কারণ হতে পারে। যদি এই ধরনের লক্ষণগুলো দীর্ঘ সময় ধরে অব্যাহত থাকে, তবে অবিলম্বে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া একান্ত জরুরি। হাড়ের স্বাস্থ্যের অবস্থা যাচাই করতে এই পরীক্ষাগুলো করিয়ে নিন

হাড়ের ঘনত্ব নির্ণায়ক পরীক্ষা (DEXA Scan)

দিল্লির ‘এইমস’ (AIIMS) হাসপাতালের অর্থোপেডিকস বিভাগের অধ্যাপক ডা. ভাবুক গর্গ জানান যে, হাড়ের শক্তি এবং ঘনত্ব পরিমাপ করার জন্যই মূলত এই পরীক্ষাটি করা হয়ে থাকে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায় যে হাড়গুলো কতটা মজবুত অবস্থায় আছে, অথবা সেগুলোতে দুর্বল হয়ে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে কি না। বিশেষ করে ‘অস্টিওপোরোসিস’ বা হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকির মাত্রা নির্ণয় করার ক্ষেত্রে এই পরীক্ষাটি অত্যন্ত সহায়ক।

ভিটামিন ডি পরীক্ষা

শরীরে ভিটামিন ডি-এর অভাব হাড়কে দুর্বল করে দিতে পারে। এই রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ভিটামিন ডি-এর মাত্রা যাচাই করা হয় এবং এটি নির্ধারণে সহায়তা করে যে, শরীরের ঠিক কতটা পরিমাণে ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট বা সূর্যের আলোর প্রয়োজন।

ক্যালসিয়াম রক্ত​পরীক্ষা

হাড়ের জন্য ক্যালসিয়াম একটি অপরিহার্য খনিজ উপাদান। এই পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে ক্যালসিয়ামের বর্তমান মাত্রা জানা যায়। ক্যালসিয়ামের অভাব হাড়ের ব্যথা এবং দুর্বলতার মতো সমস্যাগুলোকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

আরও পড়ুন : ত্বকের বারবার সংক্রমণ কোন রোগের ইঙ্গিত দেয়? জানুন এর কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে

এক্স-রে

হাড়ের ব্যথা বা কোনো আঘাত থাকলে, হাড়ের বর্তমান অবস্থা দেখার জন্য এক্স-রে করা হয়। এর মাধ্যমে হাড় ভাঙা (ফ্র্যাকচার), হাড়ের জোড়ার ক্ষতি বা হাড়ের গঠনগত অন্য কোনো অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করা সম্ভব হয়।

এমআরআই স্ক্যান

এই পরীক্ষার মাধ্যমে হাড় এবং হাড়ের চারপাশের টিস্যু বা কলাগুলোর গভীর ও বিস্তারিত পরীক্ষা করা হয়। এটি লিগামেন্ট, ডিস্ক বা নরম টিস্যু-সম্পর্কিত সমস্যাগুলো শনাক্ত করতে সহায়তা করে—এমন সব সমস্যা যা সাধারণ এক্স-রে-তে হয়তো স্পষ্টভাবে দেখা যায় না।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়

হাড় সুস্থ রাখার জন্য সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাপন পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ খাবার, যেমন—দুধ, দই এবং সবুজ শাকসবজি নিয়মিত গ্রহণ করা উচিত। প্রতিদিন হালকা ব্যায়াম বা হাঁটাচলার অভ্যাস হাড়কে শক্তিশালী রাখতে সহায়তা করে।

শরীরে পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ডি নিশ্চিত করার জন্য সূর্যের আলোতে কিছুটা সময় কাটানোও অপরিহার্য। দীর্ঘক্ষণ একই ভঙ্গিতে বসে থাকা এড়িয়ে চলা এবং বসার বা দাঁড়ানোর সময় শরীরের সঠিক ভঙ্গি (posture) বজায় রাখা বাঞ্ছনীয়। দৈনন্দিন অভ্যাসে ছোটখাটো কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনার মাধ্যমে হাড়-সম্পর্কিত সমস্যাগুলো অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

Share This Article