দেশের অনেক রাজ্যে তাপমাত্রা ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী, যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে আমাদের স্বাস্থ্যের ওপর। তীব্র রোদ এবং গরম বাতাসের (যা ‘লু’ নামে পরিচিত) সংস্পর্শে দীর্ঘক্ষণ অবস্থান করলে হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়—এমন একটি শারীরিক অবস্থা যা অত্যন্ত গুরুতর রূপ ধারণ করতে পারে। হিট স্ট্রোক হলো একটি জরুরি চিকিৎসাজনিত অবস্থা, যেখানে শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা হঠাৎ করে এবং অত্যধিক মাত্রায় বেড়ে যায় এবং শরীর তার নিজস্ব তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। সাধারণত, কোনো ব্যক্তি যখন দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র রোদ বা অত্যধিক উষ্ণ পরিবেশে অবস্থান করেন, তখনই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে শরীরের ওপর শারীরিক ধকল বা চাপ বৃদ্ধি পায়, যা শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
অতিরিক্ত ঘামের ফলে শরীর থেকে জল এবং প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান নিঃশেষ হয়ে যায়, যা এই অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি এবং যারা বাইরে বা খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন, তারা এই ঝুঁকির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে অরক্ষিত। শহরাঞ্চলে, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, দূষণ এবং কমে আসা সবুজ আচ্ছাদনের সম্মিলিত প্রভাবে এই সমস্যাটি আরও তীব্র আকার ধারণ করছে। এমতাবস্থায়, পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করা এবং সর্বদা সতর্ক থাকা জনসাধারণের জন্য অপরিহার্য।
হিট স্ট্রোকের লক্ষণগুলো কি কি?
হিট স্ট্রোকের লক্ষণগুলো হঠাৎ করেই এবং খুব দ্রুত প্রকাশ পেতে পারে। শরীরের তাপমাত্রা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং স্পর্শ করলে ত্বক গরম ও শুষ্ক অনুভূত হতে পারে। মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা, শারীরিক দুর্বলতা এবং মানসিক বিভ্রান্তি বা অসংলগ্ন আচরণ এই অবস্থার সাধারণ লক্ষণ। কারো কারো ক্ষেত্রে বমি বমি ভাব বা বমি হওয়ার পাশাপাশি সামগ্রিকভাবে শারীরিক অস্বস্তিও অনুভূত হতে পারে।
অত্যন্ত গুরুতর ক্ষেত্রে, আক্রান্ত ব্যক্তি এমনকি জ্ঞানও হারিয়ে ফেলতে পারেন। এ সময় হৃদস্পন্দনের গতি বেড়ে যায় এবং শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। অনেক সময় শরীর ঘামানো সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়—যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি বিপদসংকুল করে তুলতে পারে। যথাযথ চিকিৎসা বা ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে হিট স্ট্রোক প্রাণঘাতীও হতে পারে; তাই এই লক্ষণগুলো দ্রুত শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হিট স্ট্রোক কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়?
আরএমএল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের ডিরেক্টর প্রফেসর ডা. সুভাষ গিরি ব্যাখ্যা করেন যে, হিটস্ট্রোক প্রতিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো তীব্র রোদের সময়—বিশেষ করে দুপুরের দিকে—বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলা। যখন বাইরে বের হবেন, তখন হালকা রঙের ও ঢিলেঢালা পোশাক পরুন এবং মাথা ঢেকে রাখুন। শরীরকে আর্দ্র রাখতে এবং জলশূন্যতা রোধ করতে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করা নিশ্চিত করুন।
ডাবের জল, লেবুজল এবং ঘোল বা বাটারমিল্কের মতো পানীয়গুলোও শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সহায়তা করে। দীর্ঘক্ষণ রোদে কাজ করা থেকে বিরত থাকুন এবং বিশ্রামের জন্য ঘন ঘন বিরতি নেওয়া নিশ্চিত করুন। যদি বাইরে যাওয়া অপরিহার্য হয়, তবে ছাতা ব্যবহার করুন অথবা সানস্ক্রিন মেখে নিন। ঘরের ভেতরে শীতল পরিবেশ বজায় রাখুন এবং শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুন।
আরও পড়ুন : গ্রীষ্মকালে আমাদের পেটের সমস্যা কেন বাড়ে? এটি প্রতিরোধের উপায় কি কি ? জানুন
আরও যা গুরুত্বপূর্ণ
গ্রীষ্মকালে, আপনার দৈনন্দিন রুটিনে সামান্য কিছু পরিবর্তন আনাও অত্যন্ত জরুরি। হালকা ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করুন এবং শরীরের ওপর অহেতুক চাপ এড়াতে ভাজা বা তৈলাক্ত খাবার বর্জন করুন। শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বিশেষ নজর দিন, কারণ তারা তাপের ক্ষতিকর প্রভাবের প্রতি অধিক সংবেদনশীল হয়ে থাকে।
বাইরে থেকে ঘরে ফেরার পরপরই ঠান্ডা জল পান করা থেকে বিরত থাকুন; এর পরিবর্তে, শরীরকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফিরে আসার সুযোগ দিন। উচ্চমাত্রার ক্যাফেইনযুক্ত বা চিনিযুক্ত পানীয় পান করা সীমিত করুন। যদি কেউ তীব্র অস্বস্তি বা কোনো উপসর্গ অনুভব করেন, তবে অবিলম্বে একজন চিকিৎসকের সাথে যোগাযোগ করুন—যাতে সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায় এবং পরিস্থিতি গুরুতর আকার ধারণ করা থেকে রক্ষা পায়।