ফ্যাটি লিভারে ভুগছেন? ডিমের কুসুম খাবেন নাকি খাবেন না? জানুন

ফ্যাটি লিভার একটি বড় ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা; একে অবহেলা করলে তা ব্যক্তির সার্বিক সুস্থতার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। যারা লিভার-সম্পর্কিত এই সমস্যায় ভুগছেন, তাদের মনে ডিমের কুসুম খাওয়া উচিত কি না—এই প্রশ্নটি নিয়ে প্রায়শই এক ধরনের দ্বিধা বা সংশয় কাজ করে। আসুন, এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত বা দৃষ্টিভঙ্গি জেনে নেওয়া যাক।

5 Min Read

সমস্যাটি ‘অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ’ হোক কিংবা ‘নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ’—নির্দিষ্ট কোনো খাবার গ্রহণের আগে সেই খাবারটি সম্পর্কে সঠিক তথ্য জেনে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। এমনই একটি নির্দিষ্ট প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা হলো ডিমের কুসুম খাওয়া প্রসঙ্গে। ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বেশ কিছু ভুল ধারণা বা মিথ প্রচলিত আছে। বিভ্রান্তির একটি সাধারণ জায়গা হলো—যারা এই সমস্যায় ভুগছেন, তাদের খাদ্যতালিকায় ডিমের কুসুম রাখা উচিত কি না। এই উদ্বেগের পেছনের যুক্তিটি হলো, ডিমের কুসুমে চর্বির পরিমাণ বেশি থাকে এবং একে একটি ‘ভারী’ খাবার হিসেবে গণ্য করা হয়; ফলে, অন্যান্য খাবারের তুলনায় ডিমের কুসুম হজম করা কিছুটা বেশি কঠিন হতে পারে। ফ্যাটি লিভারের সমস্যা থাকলে সাধারণত হালকা এবং সহজে হজমযোগ্য খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। যদিও এই ধরনের রোগীদের ডিম খাওয়ার অনুমতি থাকে, তবুও ডিমের কুসুমটি খাওয়া উচিত কি না—তা নিয়ে প্রায়শই এক ধরনের অনিশ্চয়তা বা সংশয় থেকেই যায়।

একইভাবে, যারা জিমে গিয়ে শরীরচর্চা করেন, তাদেরও প্রায়শই পরামর্শ দেওয়া হয় যে—ডিমের সাদা অংশ (সেদ্ধ ডিমের) খাওয়া উপকারী হলেও, কুসুম খেলে তা পেটে চর্বি জমার বা মেদ বাড়ার কারণ হতে পারে। এই নিবন্ধে আমরা বিশেষজ্ঞদের মতামতের ওপর ভিত্তি করে সেই প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব: ফ্যাটি লিভারের সমস্যায় ভুগলে ডিমের কুসুম খাওয়া কি আদৌ যুক্তিসঙ্গত?

ডিমের গঠন উপাদান | ডিমের পুষ্টিগুণ

  1. ৫০ গ্রাম ওজনের একটি আদর্শ ডিমের হিসেবে ধরলে, এতে প্রায় ৬ থেকে ৭ গ্রাম প্রোটিন থাকে। এই পুষ্টি উপাদানটি আমাদের পেশি শক্তিশালী করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং পেশির ক্ষয়পূরণ ও পুনরুদ্ধারেও সহায়তা করে। এই কারণেই, যারা জিমে গিয়ে শরীরচর্চা করেন কিংবা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, তাদের প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণে ডিম খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
  2. চর্বির পরিমাণের দিক থেকে বিবেচনা করলে, একটি ডিমে প্রায় ৫ গ্রাম চর্বি থাকে। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ—যার মধ্যে হৃদপিণ্ডও অন্তর্ভুক্ত—সঠিকভাবে কাজ করার জন্য স্বাস্থ্যকর চর্বি বা ‘হেলদি ফ্যাট’ অপরিহার্য; পাশাপাশি এটি শরীরের শক্তির উৎস হিসেবেও কাজ করে।
  3. ক্যালোরির পরিমাণ হলো বিবেচনা করার মতো আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাধারণত ৫০ গ্রাম ওজনের একটি ডিমে ৬৫ থেকে ৭০ ক্যালোরি থাকে। এ কারণে ডিম একটি চমৎকার খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হয়; কারণ এটি আপনাকে তুলনামূলকভাবে কম ক্যালোরি গ্রহণের মাধ্যমেই প্রচুর পুষ্টিমান অর্জনের সুযোগ করে দেয়।
  4. ভিটামিনের দিক থেকে বলতে গেলে, ডিমে রয়েছে ভিটামিন A, D, B12 এবং B2। চোখের সুস্বাস্থ্যের জন্য ভিটামিন A, হাড়ের জন্য ভিটামিন D, স্নায়ুতন্ত্রের জন্য ভিটামিন B12 এবং শরীরের বিভিন্ন বিপাকীয় কাজের জন্য ভিটামিন B2 (রাইবোফ্লাভিন) অত্যন্ত জরুরি।
  5. এতে আরও রয়েছে আয়রন—যা রক্তকণিকা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে—ফসফরাস (হাড়ের জন্য অপরিহার্য), সেলেনিয়াম (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিকারী উপাদান) এবং জিঙ্ক (শরীরের সামগ্রিক বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয়)।
  6. ডিমে ‘কোলিন’ নামক একটি পুষ্টি উপাদানও থাকে, যা মস্তিষ্কের বিকাশ এবং স্মৃতিশক্তির কার্যকারিতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আপনি কি ডিমের কুসুম খাবেন, নাকি খাবেন না?

ডা. জি.এস. লাম্বার (পরিচালক, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও হেপাটোলজি বিভাগ, শ্রী বালাজি অ্যাকশন মেডিকেল ইনস্টিটিউট, দিল্লি) মতে, ‘ফ্যাটি লিভার’ বা যকৃতে চর্বি জমার সমস্যায় আক্রান্ত রোগীরা ডিম খেতে পারেন; তবে ডিমের হলুদ অংশটি (কুসুম) খাওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। ডিমের সাদা অংশে প্রোটিনের পরিমাণ বেশি এবং চর্বির পরিমাণ কম থাকে, যা যকৃতের জন্য নিরাপদ ও উপকারী।

আরও পড়ুন : ব্যায়ামের পর পেশিতে ব্যথা কেন হয়? এটি প্রতিরোধের উপায় কি জানুন

অন্যদিকে, ডিমের কুসুমে কোলেস্টেরল এবং চর্বির পরিমাণ অপেক্ষাকৃত বেশি থাকে। যদি কোনো ফ্যাটি লিভারের রোগী একই সাথে উচ্চ কোলেস্টেরল বা স্থূলতার সমস্যায় ভোগেন, তবে তাদের ডিমের কুসুম অত্যন্ত সীমিত পরিমাণে অথবা চিকিৎসকের কঠোর পরামর্শ অনুযায়ী গ্রহণ করা উচিত।

তবে, সবার জন্যই যে খাদ্যতালিকা থেকে ডিমের কুসুম পুরোপুরি বাদ দেওয়া জরুরি—এমনটা নয়; কারণ এতে ভিটামিন A, D, E এবং B12-এর মতো অপরিহার্য পুষ্টি উপাদানগুলো বিদ্যমান। মূল কথা হলো ভারসাম্য বজায় রাখা; অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রেই সপ্তাহে ২ থেকে ৩ বার একটি আস্ত ডিম খাওয়াকে সাধারণত নিরাপদ হিসেবে গণ্য করা হয়—যদিও নিজের ব্যক্তিগত শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করাই সর্বদা সর্বোত্তম।

Share This Article