সবজা বীজ থেকে শুরু করে ছাতু, এই গ্রীষ্মে পেট ঠান্ডা রাখতে এই প্রথাগত খাবারগুলোকে অভ্যাসে পরিণত করুন

আমাদের রান্নাঘরগুলো এমন সব বিচিত্র প্রথাগত উপাদানের ভাণ্ডার, যা গ্রীষ্মের মাসগুলোতে পেট ঠান্ডা রাখার উদ্দেশ্যে তৈরি। এই দেশীয় খাবারগুলোর মধ্যে, গ্রীষ্মের তীব্র তাপ মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে 'ছাতু' (Sattu) সবার শীর্ষে অবস্থান করে। আসুন আমরা আপনাদের দেখিয়ে দিই—এমনকি প্রচণ্ড দাবদাহের মধ্যেও—পেট ঠান্ডা রাখতে ঠিক কোন কোন খাবারগুলো গ্রহণ করা উচিত।

6 Min Read

গ্রীষ্মকালে এমন খাবার গ্রহণ করার জোর সুপারিশ করা হয়, যা পেটের ওপর শীতল প্রভাব ফেলে—বিশেষ করে যেসব খাবারে জলের পরিমাণ বেশি থাকে। এর পেছনের যুক্তি হলো, তীব্র তাপ এবং কড়া রোদের কারণে শরীর থেকে প্রচুর ঘাম ঝরে যায়; ফলে শরীরকে পর্যাপ্ত পরিমাণে আর্দ্র (hydrated) রাখাটা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে। আধুনিক খাদ্যাভ্যাস পর্যবেক্ষণ করলে প্রায়শই দেখা যায় যে, মানুষ এমন কিছু ভুল করে বসে যার ফলে তাদের পেটে দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল সমস্যা দেখা দেয়। জীবনযাত্রার মান এতটাই অবনমিত হয়েছে যে, খুব অল্প বয়সেই মানুষের শরীর নানা রকম রোগের আঁতুড়ঘরে পরিণত হচ্ছে। পরিশোধিত ময়দা দিয়ে তৈরি খাবার, তেলে ভাজা খাবার এবং অতিরিক্ত ঝাল-মশলাযুক্ত খাবার খাওয়ার ফলে পেটে ক্রমাগত অ্যাসিডিটি বা অম্লতা এবং হজমজনিত অস্বস্তি দেখা দেয়।

এই নিবন্ধে আমরা আপনাদের জানাব যে, কোন কোন খাবারগুলো গ্রহণ করলে আপনি কেবল আপনার পেটই ঠান্ডা রাখতে পারবেন না, বরং শরীরের আর্দ্রতার মাত্রাও কার্যকর ভাবে বজায় রাখতে পারবেন। তাছাড়া, আপনার হজম তন্ত্রকে সচল ও কর্মক্ষম রাখতেও এই খাবারগুলো অত্যন্ত কার্যকর। যখন আপনার হজম প্রক্রিয়া সুস্থ থাকে, তখন এর সুফল কেবল আপনার অভ্যন্তরীণ শারীরিক সুস্থতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা বাহ্যিক ভাবেও ফুটে ওঠে এবং আপনার ত্বককে দান করে এক সুস্থ ও উজ্জ্বল আভা।

গ্রীষ্মকালীন খাদ্যাভ্যাস: এই মৌসুমের জন্য উপযুক্ত খাবার-দাবার

জয়পুরের ক্লিনিক্যাল পুষ্টিবিদ মেধাবী গৌতম জোর দিয়ে বলেন যে—গ্রীষ্মকাল হোক কিংবা অন্য যেকোনো ঋতু—আমাদের খাদ্যাভ্যাসে সর্বদা পর্যাপ্ত পরিমাণে আঁশ বা ফাইবার থাকা উচিত। পাশাপাশি, আমাদের খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে শরীরের আর্দ্রতার মাত্রাও যেন যথাযথভাবে বজায় থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। গ্রীষ্মের মাসগুলোতে তরমুজ এবং ফুটির (muskmelon) মতো ফলগুলো প্রচুর পরিমাণে খাওয়া হয় এবং পুষ্টিবিদরাও এগুলো খাওয়ার বিশেষ পরামর্শ দিয়ে থাকেন। সবজির মধ্যে শসা খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় সবার আগে। বিশেষজ্ঞরা তেলে ভাজা এবং অতিরিক্ত ঝাল-মশলাযুক্ত খাবার যথাসম্ভব কম খাওয়ার পরামর্শ দেন; কারণ এই ধরনের খাবারগুলো পেটের ভেতর অতিরিক্ত তাপ বা উষ্ণতা তৈরি করে।

ছাতু থেকে শুরু করে শসা… যেসব খাবার পেট ঠান্ডা রাখে

ছাতু: গ্রীষ্মকালের এক অনন্য ‘সুপারফুড’—হিটস্ট্রোক বা লু-এর প্রকোপ থেকে এবং গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহ থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য এমন সব খাবার ও পানীয় গ্রহণ করা অপরিহার্য, যা পেটের ভেতর একটি শীতল অনুভূতি বজায় রাখতে সহায়তা করে। এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে ‘সত্তু’ (Sattu)। এটি পুষ্টি উপাদানের এক বিশাল ভাণ্ডার এবং এর শীতলকারী গুণাগুণ পেটের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এই ঐতিহ্যবাহী খাবারটি ভাজা ছোলা এবং বার্লি গুঁড়ো করে তৈরি করা হয়। পেট ঠান্ডা রাখার পাশাপাশি, এটি আমাদের সারাদিন সতেজ ও কর্মচঞ্চল রাখতে সাহায্য করে।

ভারতের গ্রামাঞ্চলে, আজও গ্রীষ্মের মাসগুলোতে বাড়ির বাইরে বের হওয়ার আগে মানুষ সত্তু-জল পান করে থাকেন। পুষ্টি উপাদানের দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, এতে প্রোটিন এবং ফাইবার—উভয়ই প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান। এর সবচেয়ে বড় উপকারিতা হলো, এটি শরীরের সঠিক ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করার মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবেই আমাদের ‘হিটস্ট্রোক’ বা লু-এর প্রকোপ থেকে রক্ষা করে।

এটি হজমশক্তির উন্নতি ঘটায়, যার ফলে গ্রীষ্মকালীন সাধারণ সমস্যাগুলো—যেমন: অ্যাসিডিটি, কোষ্ঠকাঠিন্য এবং বদহজম—থেকে আমরা সুরক্ষিত থাকি। এর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এটি একটি প্রাকৃতিক ‘এনার্জি বুস্টার’ বা শক্তি-বর্ধক হিসেবে কাজ করে; গ্রীষ্মকালে এটি সেবন করলে শরীর সারাদিন ধরে কর্মশক্তি বজায় রাখতে সক্ষম হয়।

আরও পড়ুন : গ্রীষ্মকালে চুল সোজা করার জন্য অ্যালোভেরা জেল থেকে ডিম—ঘরোয়া প্রতিকারসমূহ সম্বন্ধে জানুন

লেবু ও পুদিনার শরবত: পুদিনা পাতায় প্রাকৃতিকভাবেই শীতলকারী গুণাগুণ বিদ্যমান, যা গ্রীষ্মকালে এটিকে খাদ্য বা পানীয়—উভয় রূপেই একটি চমৎকার পছন্দ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তাছাড়া, গ্রীষ্মের মাসগুলোতে লেবু পেটের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ প্রমাণিত হয়। লেবুতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’ থাকে, যা শরীরের জন্য একটি অপরিহার্য পুষ্টি উপাদান। এই দুটি উপাদানকে একত্রিত করে আপনি একটি অত্যন্ত সতেজ ও তৃপ্তিদায়ক পানীয় তৈরি করে নিতে পারেন।

শসার পানীয়: শসা—যা প্রায়শই গ্রীষ্মকালীন ‘সুপারফুড’ হিসেবে সমাদৃত হয়—তার প্রায় ৯৫ শতাংশই জল দিয়ে গঠিত। গ্রীষ্মকালে শসা সেবন করা অত্যন্ত উপকারী বলে মনে করা হয়; কারণ এটি কেবল শরীরের আর্দ্রতাই বজায় রাখে না, বরং হজমশক্তির উন্নতিতেও সহায়তা করে। যেহেতু এতে প্রচুর পরিমাণে ফাইবার বা আঁশ থাকে, তাই প্রতিদিন শসা খেলে হজমতন্ত্র সুস্থ ও সচল থাকে। তাছাড়া, এটি একটি স্বল্প-ক্যালোরি যুক্ত খাবার হওয়ায় ওজন কমাতেও সহায়তা করে। শসা সালাদ হিসেবে কিংবা রস বা জুস হিসেবেও খাওয়া যেতে পারে। বিকল্প হিসেবে, আপনি শসার টুকরো সারারাত জলে ভিজিয়ে রাখতে পারেন; এটি একটি অত্যন্ত কার্যকর ‘ডিটক্স ড্রিংক’ হিসেবে কাজ করে।

ডাবের জল: শরীরের ইলেক্ট্রোলাইট ভারসাম্য সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখতে প্রতিদিন ডাবের জল পান করার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। এটি গ্রীষ্মকালের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট পানীয়; কারণ এটি হজমশক্তির উন্নতি ঘটায় এবং পেট ঠান্ডা রাখে। তাছাড়া, এটি সারাদিন ধরে শরীরকে সতেজ ও কর্মচঞ্চল রাখতে সহায়তা করে।

সবজা বীজ সেবন: ‘সবজা বীজ’—যা ‘তুলসী বীজ’ হিসেবেও পরিচিত—গ্রীষ্মকালে সেবন করলে দ্বিগুণ উপকার পাওয়া যায়; এর মূল কারণ হলো এর শীতলকারী গুণাগুণ। সবজা বীজ জলে ভিজিয়ে রেখে সেবন করলে নানাবিধ উপকার পাওয়া যায়, যার মধ্যে হজমশক্তির উন্নতি অন্যতম। আপনি পানীয়ের সাথে সাবজা বীজ মিশিয়ে নিতে পারেন, অথবা গ্রীষ্মের উপযোগী বিভিন্ন খাবারের সাথে সেগুলোকে যুক্ত করতে পারেন।

Share This Article