আজকাল অনেক মানুষই সারা দিন ধরে ক্লান্তিবোধ করেন, এমনকি কোনো কঠোর শারীরিক পরিশ্রম না করা সত্ত্বেও। শক্তির অভাব, সাধারণ দুর্বলতা এবং অলসতা—এ সবই এই অবস্থার লক্ষণ হতে পারে। প্রায়শই এর মূল কারণ কেবল ঘুমের অভাব নয়, বরং শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিনের ঘাটতি। ক্লান্তির সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে একটানা দুর্বলতাবোধ, কাজে উৎসাহের অভাব, মাথা ঘোরা, পেশিতে ব্যথা, মনোযোগ দিতে অসুবিধা এবং খুব সহজেই ক্লান্ত হয়ে পড়া।
কেউ কেউ সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় শ্বাসকষ্ট, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া বা মাথায় ভারী বোধ করার মতো অভিজ্ঞতারও সম্মুখীন হতে পারেন। কিছু ক্ষেত্রে, ক্ষণিকের জন্য চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে যাওয়া বা বারবার শুয়ে পড়ার তীব্র ইচ্ছা জাগাও সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করতে পারে। যদি এই লক্ষণগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকে, তবে সেগুলোকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। শরীর যদি পর্যাপ্ত পুষ্টি না পায়, তবে সমস্যাটি আরও তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। তাই, সঠিক সময়ে এর অন্তর্নিহিত কারণটি শনাক্ত করা এবং উপযুক্ত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। চলুন জেনে নেওয়া যাক, ঠিক কোন ভিটামিনটি ক্লান্তি দূর করতে সহায়তা করে।
কোন ভিটামিন ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে?
লেডি হার্ডিঞ্জ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের পরিচালক ও প্রধান ডা. এল.এইচ. ঘোটেকর ব্যাখ্যা করেন যে, ক্লান্তি দূর করার ক্ষেত্রে ভিটামিন B12-কে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই ভিটামিনটি শরীরে লোহিত রক্তকণিকা তৈরিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং স্নায়ুতন্ত্রের সঠিক কার্যকারিতায় সহায়তা করে। যখন শরীরে ভিটামিন B12-এর ঘাটতি দেখা দেয়, তখন একজন ব্যক্তি দুর্বলতা, মাথা ঘোরা এবং একটানা ক্লান্তিবোধ করতে শুরু করেন।
তাছাড়া, এই ভিটামিনটি শরীরের শক্তি উৎপাদনের প্রক্রিয়াগুলোতেও সহায়তা করে। ভিটামিন B12-এর অভাবে শরীরে অক্সিজেনের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে, যার ফলে অকালেই ক্লান্তি ভর করে। তাই, যদি কোনো ব্যক্তি একটানা ক্লান্তিবোধ করতে থাকেন, তবে তার শরীরে ভিটামিন B12-এর মাত্রা পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন হতে পারে।
কীভাবে শরীরকে এই ভিটামিনটি সরবরাহ করবেন?
শরীরে ভিটামিন B12-এর পর্যাপ্ত মাত্রা বজায় রাখার জন্য সঠিক পুষ্টি গ্রহণ অপরিহার্য। এটি অর্জনের লক্ষ্যে, দুধ, দই, পনির, ডিম, মাছ এবং মাংসের মতো খাবারগুলো খাদ্যাভ্যাসে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। যারা নিরামিষ খাদ্যাভ্যাস মেনে চলেন, তাদের জন্য ‘ফর্টিফাইড ফুড’ বা পুষ্টি-সমৃদ্ধ খাবারগুলো একটি চমৎকার বিকল্প হিসেবে কাজ করতে পারে।
কিছু কিছু ক্ষেত্রে, চিকিৎসকরা ভিটামিন B12 সাপ্লিমেন্ট বা ইনজেকশন গ্রহণেরও পরামর্শ দিতে পারেন। তবে, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া সাধারণত কোনো সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত নয়। একটি সুষম খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে প্রাকৃতিকভাবেই শরীরের ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করাকে সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে গণ্য করা হয়।
আরও পড়ুন : শরীরে আয়রনের মাত্রা বাড়াতে কি কি খাবার খাওয়া উচিত? জানুন
জীবনযাত্রার মান উন্নয়নও অপরিহার্য
কেবল খাদ্যাভ্যাসই নয়; ক্লান্তি বা অবসাদের মাত্রাকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে জীবনযাত্রাও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রতিদিন পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা—যার মধ্যে রাতে ঘুমানো ও সকালে ঘুম থেকে ওঠার একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে চলাও অন্তর্ভুক্ত—অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া, হালকা ব্যায়াম বা যোগব্যায়ামে অংশ নেওয়া শরীরকে সচল ও কর্মক্ষম রাখতে সহায়তা করে। অত্যধিক মানসিক চাপও ক্লান্তির সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলতে পারে; তাই মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
‘স্ক্রিন টাইম’ বা মোবাইল-কম্পিউটারের পর্দার সামনে কাটানো সময় কমিয়ে আনা এবং সারা দিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে ছোট ছোট বিরতি নেওয়াও বেশ সুফল বয়ে আনতে পারে। একটি স্বাস্থ্যকর দৈনন্দিন রুটিন মেনে চলা শরীরের শক্তির মাত্রা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং ক্লান্তিজনিত সমস্যাগুলো কার্যকরভাবে লাঘব করতে সক্ষম হয়।