গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে সাপেরা তাদের গর্ত বা আস্তানা থেকে বেরিয়ে আসে। মাটির নিচে থাকা তাদের জন্য অসহনীয় গরম হয়ে ওঠে এবং বৃষ্টির জলেতে তাদের আস্তানা প্লাবিত হতে পারে, যার ফলে তারা বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়। এই ঋতুগুলোতেই সাপ দেখার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।
তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটছে। বিষধর সাপের ওপর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিচালিত গবেষণা অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে সাপে কামড়ানোর ঝুঁকি বাড়ছে; কারণ ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও মানুষের চাপের সাথে মানিয়ে নিতে এই সরীসৃপগুলোকে তাদের আবাসস্থল পরিবর্তন করতে হচ্ছে।
‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর একটি প্রতিবেদনে এই গবেষণার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা গেছে যে, জলবায়ু বিপর্যয় ও ভূ-প্রকৃতির পরিবর্তনের ফলে আফ্রিকার ‘স্পিটিং কোবরা’, ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার ‘ভাইপার’, উত্তর আমেরিকার ‘কটনমাউথ মকাসিন’ এবং এশিয়ার ‘ক্রেইট’ সাপের সাথে মানুষের সংস্পর্শ বা মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা বাড়ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সাধারণত বিভিন্ন প্রজাতির বিলুপ্তি বা সংখ্যা কমে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ থাকে; কিন্তু সাপের ক্ষেত্রে বিষয়টি ঠিক উল্টো হতে পারে বলে এই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। এদের সংখ্যা, বিশেষ করে সবচেয়ে বিষধর সাপগুলোর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের ফলে সাপ এমন সব এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে যেখানে আগে তাদের দেখা যায়নি এবং এর ফলে কোটি কোটি মানুষ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডেভিড উইলিয়ামস বলেন, “মানুষ ও বিষধর সাপের মধ্যে মুখোমুখি হওয়ার বা সংস্পর্শে আসার ঘটনা বাড়বে।” তিনি আরও বলেন, “বিষয়টিকে এভাবে ভাবা যেতে পারে—বাড়ির পেছনের দরজা দিয়ে বের হওয়ার সময় হোঁচট খেয়ে সাপের কামড় খাওয়ার ঝুঁকি।”
সাপে কামড় দিলে প্রথম এক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে শান্ত থাকা এবং দ্রুত চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করা জরুরি। সাপটিকে স্পষ্টভাবে দেখতে না পেলেও প্রতিটি কামড়কেই সম্ভাব্য বিষধর সাপের কামড় হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
সাপের কাছ থেকে অবিলম্বে সরে যান, তবে দৌড়াবেন না। কামড় খাওয়া স্থানটি স্থির রাখুন এবং অপ্রয়োজনীয় নড়াচড়া এড়িয়ে চলুন, যাতে বিষ ধীরে ছড়ায়। দ্রুত জরুরি সেবা বা স্থানীয় জরুরি নম্বরে কল করুন। পাশাপাশি পরিবার বা আশেপাশের মানুষকে বিষয়টি জানান, যাতে কেউ আপনার পাশে থাকতে পারে এবং প্রয়োজনে আপনাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে। দংশিত অঙ্গটি হৃদপিণ্ডের উচ্চতায় বা তার সামান্য নিচে রাখুন এবং ফোলা শুরু হওয়ার আগেই আংটি, ঘড়ি বা জুতার মতো আঁটসাঁট জিনিস খুলে ফেলুন। সম্ভব হলে সাবান ও জল দিয়ে ক্ষতস্থানটি আলতো করে পরিষ্কার করুন এবং এরপর একটি পরিষ্কার ও শুকনো ব্যান্ডেজ বা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিন।
মনে রাখা জরুরি যে, দংশিত স্থানটি কাটা, মুখ দিয়ে বিষ চুষে বের করার চেষ্টা করা কিংবা টর্নিকেট (রক্ত চলাচল বন্ধ করার জন্য শক্ত বাঁধন) বা বরফ ব্যবহার করা উচিত নয়। অ্যালকোহল, ক্যাফেইন কিংবা অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনের মতো ব্যথানাশক ওষুধ সেবন থেকে বিরত থাকুন, কারণ এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। সাপের রঙ ও আকার মনে রাখার বা বর্ণনা করার চেষ্টা করুন এবং পরিস্থিতি নিরাপদ হলে চিকিৎসকদের দেখানোর জন্য দূর থেকে একটি ছবি তুলে রাখুন।
আরও পড়ুন : A1 বনাম A2 দুধ: আসল পার্থক্য কি এবং কোনটি বেশি স্বাস্থ্যকর?
যদি মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, শ্বাসকষ্ট বা দংশিত স্থানের চারপাশে ফোলাভাব, তীব্র ব্যথা কিংবা রক্তপাত লক্ষ্য করেন, তবে এগুলো অত্যন্ত বিপজ্জনক লক্ষণ হিসেবে গণ্য হবে এবং অবিলম্বে চিকিৎসা কর্মীদের বিষয়টি জানাতে হবে।
সাপটিকে ধরার বা মারার চেষ্টা করবেন না। ঘটনার প্রথম এক ঘণ্টার মধ্যে মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত আক্রান্ত ব্যক্তির নড়াচড়া যথাসম্ভব কমিয়ে আনা, তাকে স্থিতিশীল রাখা এবং অ্যান্টিভেনম ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে এমন কোনো হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দ্রুত পৌঁছানো।