বর্তমান সময়ে চোখের নিচে যে কালো বলয় বা ‘ডার্ক সার্কেল’ দেখা যায়, তা কেবল রাত জাগারই ফলাফল নয়; এর পেছনে আরও অনেক অন্তর্নিহিত কারণ কাজ করে। মোবাইল ফোন বা ল্যাপটনের অত্যধিক ব্যবহার, মানসিক চাপের বৃদ্ধি, অপর্যাপ্ত ঘুম, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং শরীরে পুষ্টির অভাব—এই সবকিছুই চোখের নিচের কালি আরও বাড়িয়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান না করা এবং চোখকে প্রয়োজনীয় বিশ্রাম না দেওয়াও এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে; যার ফলে মুখমণ্ডলকে ক্লান্ত এবং বয়সের তুলনায় অধিক বয়স্ক দেখায়।
আজকের এই দ্রুতগতির জীবনযাত্রায় মানুষ প্রায়শই তাদের দৈনন্দিন রুটিন এবং স্বাস্থ্যের প্রতি যথাযথ মনোযোগ দিতে ব্যর্থ হয়—আর এই অবহেলার ছাপ সবার আগে এবং সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে মুখমণ্ডলজুড়েই। বিশেষ করে চোখের চারপাশের ত্বক অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কোমল হয়ে থাকে; যার ফলে এই অংশে চোখের নিচের কালি খুব দ্রুত দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। আপনি যদি নিয়মিত তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যান, তবুও যদি চোখের নিচের কালির সমস্যায় ভোগেন, তবে বুঝতে হবে এর পেছনে অন্য কোনো অন্তর্নিহিত কারণ কাজ করছে। এই নিবন্ধে, চলুন চোখের নিচে কালি পড়ার নেপথ্যে থাকা বিভিন্ন কারণগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।
বিশেষজ্ঞরা কি বলেন?
কসমেটিক সার্জন ডা. গীতা গ্রেওয়ালের মতে, চোখের নিচে কালি পড়ার অন্যতম একটি কারণ হতে পারে চোখের নিচের ত্বকের স্তরে থাকা চর্বি বা ‘সাবকিউটেনিয়াস ফ্যাট’ কমে যাওয়া। বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রাকৃতিকভাবেই এই চর্বির পরিমাণ কমতে শুরু করে। চোখের নিচের এই চর্বি যখন নিঃশেষ হয়ে যায়, তখন ওই স্থানে সামান্য গর্ত বা ‘Hollowness’ (ফাঁপা ভাব) তৈরি হয়। ঠিক এই কারণেই চোখের নিচে কালি বা কালো দাগগুলো আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে, চোখের নিচে কালি পড়ার পেছনে বংশগত বা জিনগত কারণেরও ভূমিকা থাকতে পারে।
চোখের নিচে কালি পড়ার কারণগুলো কি কি?
ঘুমের অভাব: যখন আপনি পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমান না, তখন আপনার ত্বককে নিস্তেজ এবং প্রাণহীন দেখায়। এর ফলে চোখের নিচের অংশে থাকা রক্তনালীগুলো আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে, যা চোখের নিচে কালি পড়ার মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের অভাব বা অনিদ্রা এই সমস্যাকে আরও মারাত্মক আকার দিতে পারে।
বংশগতি: চোখের নিচে কালো দাগ বা ‘ডার্ক সার্কেল’ প্রায়শই বংশগত হয়ে থাকে। আপনার বাবা-মা কিংবা পরিবারের অন্য কোনো সদস্য যদি এই সমস্যায় ভুগে থাকেন, তবে আপনারও এই সমস্যা দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। সাধারণত চোখের নিচের ত্বক পাতলা হওয়া কিংবা ত্বকে রঞ্জক পদার্থের (pigmentation) আধিক্যের মতো বিষয়গুলোকে এর কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়।
বার্ধক্য: বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের ত্বক স্বাভাবিকভাবেই পাতলা হয়ে আসে এবং এর দৃঢ়তা বা টানটান ভাব হারাতে শুরু করে। ত্বকে কোলাজেনের মাত্রা কমে যাওয়ার ফলে চোখের নিচের রক্তনালীগুলো আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, যার ফলে চোখের নিচের কালো দাগগুলো আরও প্রকটভাবে ফুটে ওঠে।
স্ক্রিন টাইম এবং চোখের ওপর চাপ: মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ বা টেলিভিশনের অত্যধিক ব্যবহারের ফলে চোখের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়। এর ফলে চোখের চারপাশের রক্তনালীগুলো প্রসারিত হয়ে যায়, যা চোখের নিচের কালো দাগগুলোকে আরও গাঢ় বা কালচে করে তুলতে পারে।
আরও পড়ুন : শ্যাম্পু না করেই আঠালো চুলকে মুহূর্তেই সতেজ করে তোলার ৫টি উপায় জানুন
চোখের নিচের কালো দাগ দূর করার ঘরোয়া উপায়
যদিও চোখের নিচের কালো দাগ দূর করার জন্য বাজারে অসংখ্য প্রসাধনী বা পণ্য পাওয়া যায়, তবুও আপনি প্রাকৃতিক ঘরোয়া উপায় ব্যবহার করেও এর কার্যকর প্রতিকার করতে পারেন। সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতিগুলোর মধ্যে একটি হলো ‘গ্রিন টি ব্যাগ’ (সবুজ চায়ের ব্যাগ) ব্যবহার করা। খুব সহজ একটি কাজ—প্রতিটি চোখের নিচে একটি করে গ্রিন টি ব্যাগ রাখুন এবং কিছুক্ষণ রেখে দিন, এরপর সেগুলো সরিয়ে ফেলুন। গ্রিন টি ব্যাগে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, যা চোখের ফোলাভাব বা প্রদাহ কমাতে এবং কালো দাগের দৃশ্যমানতা হ্রাস করতে সহায়তা করে।
এ ছাড়াও, আপনি আলুর রস বা শসার রস ব্যবহার করতে পারেন। একটি আলু বা শসা থেকে রস বের করে নিন এবং একটি তুলার প্যাড বা টুকরো ব্যবহার করে চোখের চারপাশের ত্বকে সেই রস লাগিয়ে নিন। ১৫ মিনিট পর ঠান্ডা জল দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন। এই উপাদানগুলোতেও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এবং প্রাকৃতিক ব্লিচিং উপাদান থাকে, যা চোখের নিচের কালো দাগ দূর করতে অত্যন্ত সহায়ক।