ভারতীয় ঘরগুলোতে খাবার খাওয়ার পর মৌরি খাওয়ার একটি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য প্রচলিত আছে। তবে এটি কেবলই একটি প্রথা বা আচার নয়; ঐতিহাসিকভাবে এটি হজমতন্ত্রকে সুস্থ রাখার একটি অত্যন্ত কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। গ্রীষ্মকালে মৌরি খাওয়াকে আরও বেশি উপকারী মনে করা হয়, কারণ মৌরির রয়েছে প্রাকৃতিকভাবেই শরীর শীতল করার ক্ষমতা। প্রত্যেকেরই উচিত তাদের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে—বিশেষ করে গ্রীষ্মের উষ্ণ দিনগুলোতে—অল্প পরিমাণে মৌরি অন্তর্ভুক্ত করা। এই নিবন্ধে আমরা মৌরি এবং মিছরি (Mishri) দিয়ে তৈরি এমন একটি বিশেষ পানীয় সম্পর্কে আলোচনা করব, যা খেতে সুস্বাদু তো বটেই, পাশাপাশি এই ঋতুতে সচরাচর দেখা দেওয়া বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা থেকে মুক্তি দিতেও সক্ষম।
মৌরি-ভিত্তিক এই পানীয়টির প্রস্তুত প্রণালীটি শেয়ার করেছেন পুষ্টিবিদ রাজমণি প্যাটেল। তিনি প্রায়শই এমন সব সাধারণ ও নিত্যনৈমিত্তিক উপকরণের কথা তুলে ধরেন, যা সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। এই উপকরণগুলোর অধিকাংশই সম্ভবত আপনার নিজের রান্নাঘরেই আগে থেকে মজুদ রয়েছে। এই গ্রীষ্মে, আপনিও পুষ্টিবিদ রাজমণি প্যাটেলের সুপারিশকৃত এই মৌরি-ভিত্তিক ‘সুপার-ড্রিঙ্ক’টি একবার তৈরি করে দেখতে পারেন—এটি এমন একটি ঘরোয়া প্রতিকার, যা কেবল একটি নয়, বরং ভিন্ন ভিন্ন দশটি স্বাস্থ্য সমস্যা থেকে মুক্তি দিতে কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।
পানীয়ের ‘প্রি-মিক্স’ তৈরির উপকরণসমূহ
আপনি এই পানীয়টির জন্য প্রয়োজনীয় মিশ্রণ বা ‘প্রি-মিক্স’টি আগে থেকেই তৈরি করে রাখতে পারেন; এর ফলে যখনই আপনার প্রয়োজন হবে, মাত্র এক মিনিটের মধ্যেই আপনি এক গ্লাস সতেজ পানীয় প্রস্তুত করে নিতে পারবেন। এই প্রি-মিক্সটি তৈরি করার জন্য আপনার প্রয়োজন হবে: ১ কাপ মৌরি, ১ কাপ সুতো-যুক্ত মিছরি (Mishri), এবং ৫-৬টি সবুজ এলাচ (স্বাদের জন্য)।
প্রি-মিক্স তৈরির প্রস্তুত প্রণালী
১. প্রথমে একটি পাত্রে নিয়ে মৌরিগুলো খুব কম আঁচে হালকা করে ভেজে নিন। মৌরিগুলো যেন পুড়ে না যায়, সেজন্য ভাজার সময় ক্রমাগত নাড়তে থাকুন।
২. মৌরিগুলো ভাজা হয়ে গেলে সেগুলোকে একটি থালায় ঢেলে নিন এবং সম্পূর্ণভাবে ঠান্ডা হতে দিন।
৩. মৌরি দানাগুলো ঠান্ডা হয়ে গেলে, এর সাথে মিছরি (Mishri) এবং সবুজ এলাচ মিশিয়ে নিন। এই তিনটি উপাদান একসাথে মিহি গুঁড়ো করে নিন। প্রস্তুতকৃত এই গুঁড়োটি একটি বায়ুরোধী কাঁচের পাত্রে ঠান্ডা ও শুকনো স্থানে সংরক্ষণ করুন।
এই গ্রীষ্মকালীন পানীয়টি কীভাবে তৈরি করবেন?
এই পানীয়টি তৈরি করতে, এক গ্লাস ঠান্ডা জল বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার জল নিন। মনে রাখবেন, জল যেন অতিরিক্ত ঠান্ডা না হয়। এবার, এতে ১ বা ২ চা চামচ প্রস্তুতকৃত গুঁড়ো (premix powder) যোগ করুন। একটি চামচ দিয়ে ভালো করে নাড়ুন যতক্ষণ না গুঁড়োটি পুরোপুরি গলে যায়। চাইলে স্বাদের জন্য সামান্য লেবুর রসও যোগ করতে পারেন।
১০টিরও বেশি উপকারিতা
- এই পানীয়টি পান করলে হজমশক্তির উন্নতি ঘটে এবং গ্যাসের সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
- মৌরি-ভিত্তিক এই পানীয়টি গ্রীষ্মকালে সচরাচর দেখা দেওয়া অ্যাসিডিটি এবং পেটের জ্বালাপোড়া থেকে স্বস্তি প্রদান করে।
- গরমের দিনে, এই পানীয়টি শরীরকে পর্যাপ্ত পরিমাণে আর্দ্র (hydrated) রেখে প্রাকৃতিকভাবে শরীরের তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে।
- মৌরি এবং এলাচ হলো চমৎকার প্রাকৃতিক সতেজতাদায়ক উপাদান; এই পানীয়টি নিঃশ্বাসকে সতেজ করে এবং মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে সাহায্য করে।
- মৌরি ও মিছরির এই মিশ্রণটি শরীরকে আর্দ্র রাখার পাশাপাশি শীতলতাও প্রদান করে, যার ফলে এটি হিটস্ট্রোক বা লু-এর প্রকোপ থেকে সুরক্ষা দেয়।
- এই পানীয়টিতে মিছরি নামক একটি প্রাকৃতিক মিষ্টি উপাদান থাকে, যা তাৎক্ষণিকভাবে শরীরের শক্তি বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে।
- গ্রীষ্মকালে যদি আপনি পেট ফাঁপা বা পেটে ভারী ভাব অনুভব করার মতো সমস্যায় ভোগেন, তবে এই পানীয়টি পান করা আপনার জন্য অত্যন্ত উপকারী হতে পারে।
- মৌরি ও মিছরির এই মিশ্রণটি গ্রীষ্মের তীব্র গরমে সৃষ্ট গলার অস্বস্তি ও শুষ্কতা দূর করতেও সাহায্য করে।
- অতিরিক্ত গরমে মুখে যে ঘা বা আলসার হয়, তা সারাতে এই পানীয়টি বেশ কার্যকর; কারণ এটি পাকস্থলীকে শীতল রাখার কাজ করে।
- ত্বক-সম্পর্কিত বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রেও এই পানীয়টিকে উপকারী হিসেবে গণ্য করা হয়।
আরও পড়ুন : শরীরের মেদ কমাতে চান? এই ১০টি প্রোটিন এড়িয়ে চলুন
সতর্কতা এবং বর্জনীয় বিষয়সমূহ
এই পানীয়টি অতিরিক্ত পরিমাণে পান করবেন না; প্রতিদিন ১ থেকে ২ চা চামচ পান করাই যথেষ্ট। অতিরিক্ত পরিমাণে পান করলে ডায়রিয়া বা ক্ষুধামন্দার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। আপনার যদি ডায়াবেটিস থাকে, তবে এই পানীয়টি এড়িয়ে চলাই শ্রেয়; কারণ এতে থাকা মিছরি রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়া, যারা নিম্ন রক্তচাপ বা লো ব্লাড প্রেশারের সমস্যায় ভুগছেন, তাদেরও এই পানীয়টি পান করা থেকে বিরত থাকা উচিত। গর্ভবতী নারীদের এটি কেবল সীমিত পরিমাণে গ্রহণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।