স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং সতর্কতার সাথে ‘ক্যালোরি ডেফিসিট’ (খাদ্যগ্রহণের চেয়ে ক্যালোরি খরচের পরিমাণ বেশি রাখা) বজায় রাখার চেষ্টা করা—সবই করছেন, তবুও কেন ওজন কমছে না? এর উত্তর হয়তো আপনার স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্তের মধ্যে নেই, বরং লুকিয়ে আছে এমন কিছু দৈনন্দিন অভ্যাসের মধ্যে যা হয়তো আপনার চোখেই পড়ে না। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব থেকে শুরু করে অতিরিক্ত ব্যায়াম—এমন কিছু আচরণ নীরবে আপনার ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে, সবকিছু ঠিকঠাক করছেন বলে মনে হলেও ওজন কমানো কঠিন হয়ে পড়ে। সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, এই অভ্যাসগুলো প্রায়শই আপনার অজান্তেই আপনার ক্ষুধা এবং খাওয়ার ধরনকে প্রভাবিত করে।
চেন্নাই-ভিত্তিক ফিটনেস কোচ রাজ গণপথ—যিনি ‘স্লো বার্ন মেথড’-এর প্রতিষ্ঠাতা, ‘কোয়াড ফিটনেস’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান কোচ এবং ‘সিম্পল, নট ইজি’ (Simple, Not Easy) বইটির লেখক—এমন চারটি আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ অভ্যাসের কথা জানিয়েছেন যা নীরবে আপনাকে অতিরিক্ত খেতে প্ররোচিত করতে পারে এবং আপনার অজান্তেই দৈনিক ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। ১৭ জুন শেয়ার করা একটি ইনস্টাগ্রাম ভিডিওতে এই ফিটনেস কোচ উল্লেখ করেন, “এই চারটি কাজ করার সময় আপনি যা ভাবেন, তার চেয়ে অনেক বেশি খেয়ে ফেলেন। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, আপনি তা টেরও পান না।”
১. ঘুমের অভাব
রাজ-এর মতে, ঘুমের অভাব আপনার খাদ্যাভ্যাস বা খাবার নির্বাচনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে এবং উচ্চ-ক্যালোরিযুক্ত খাবারকে অনেক বেশি আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। যখন আপনার ঘুমের ঘাটতি থাকে, তখন শরীর দ্রুত শক্তি পাওয়ার জন্য চিনিযুক্ত, শর্করা-সমৃদ্ধ (স্টার্চি) এবং উচ্চ-ক্যালোরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হয়। ফলে, আপনি নিজেকে সংযত রাখার চেষ্টা করলেও অজান্তেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি খেয়ে ফেলতে পারেন।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, “যখন আপনার ঘুমের অভাব থাকে, তখন উচ্চ-ক্যালোরিযুক্ত খাবারগুলো অত্যন্ত লোভনীয় মনে হয়। মিষ্টি, মুচমুচে বা শর্করা-সমৃদ্ধ খাবার—এসব খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা জাগে। নিজেকে যতই নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করুন না কেন, কোনো না কোনোভাবে আপনি সেই প্রলোভনের কাছে নতিস্বীকার করেই ফেলেন। শেষ পর্যন্ত আপনি স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি খেয়েই ফেলেন, অথচ বিষয়টি আপনার নজরেই আসে না।”
২. প্রোটিন ও ফাইবার কম থাকা খাবার
ফিটনেস কোচ ব্যাখ্যা করেন যে, যেসব খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন ও শাকসবজি থাকে না, সেগুলোতে প্রায়শই কার্বোহাইড্রেট ও চর্বির পরিমাণ অত্যধিক থাকে। যেহেতু পেট ভরা অনুভূতি বজায় রাখতে এবং দীর্ঘক্ষণ ক্ষুধা না লাগার ক্ষেত্রে প্রোটিন ও ফাইবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তাই কার্বোহাইড্রেট-প্রধান খাবারগুলো খেলে তৃপ্তি কম পাওয়া যায়। এর ফলে, পেট ভরার জন্য আপনি হয়তো বেশি পরিমাণে খাবার খান অথবা খাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই আবার ক্ষুধার্ত বোধ করেন; যার ফলে দিনজুড়ে আপনার মোট ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।
রাজ বলেন, “যখন আপনি এমন খাবার খান যাতে প্রোটিন ও শাকসবজি খুব কম থাকে, তখন তাতে প্রোটিন ও ফাইবারের পরিমাণ কম এবং কার্বোহাইড্রেট ও চর্বির পরিমাণ বেশি থাকে। ফলে পেট ভরার অনুভূতি বা তৃপ্তি কম হয় এবং পেট ভরানোর জন্য অনেক বেশি খাবারের প্রয়োজন পড়ে। এতে অজান্তেই আপনি অনেক বেশি খাবার খেয়ে ফেলেন এবং বেশি ক্যালোরি গ্রহণ করেন।”
৩. জলশূন্যতা (ডিহাইড্রেশন)
ফিটনেস কোচের মতে, জলশূন্যতার কারণে মস্তিষ্ক অনেক সময় তৃষ্ণাকে ক্ষুধা বলে ভুল করতে পারে। এর ফলে, শরীর যখন আসলে ক্যালোরির পরিবর্তে তরল বা জল চাইছে, তখনও আপনি হয়তো স্ন্যাকস বা বাড়তি খাবার খেয়ে ফেলছেন।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, “জলশূন্যতা থাকলে মস্তিষ্ক তৃষ্ণা ও ক্ষুধার মধ্যে পার্থক্য করতে গুলিয়ে ফেলতে পারে। এ কারণেই অনেক সময় প্রকৃত ক্ষুধা না থাকলেও তৃষ্ণার কারণে আপনি খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়েন। আর সঠিক খাবার খেলেও দেখা যায় যে, আপনি স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি খেয়ে ফেলেছেন।”
আরও পড়ুন : গ্রীষ্মকালীন স্বাস্থ্য টিপস: তীব্র গরমে যেসব খাবার এড়িয়ে চলা উচিত
৪. অতিরিক্ত ব্যায়াম
রাজের মতে, অত্যধিক বা খুব কঠোর ব্যায়াম অনেক সময় আপনার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের বিপরীত ফল বয়ে আনতে পারে। অতিরিক্ত প্রশিক্ষণের ফলে শরীরের ওপর চাপ পড়ে এবং শরীরকে পুনরুদ্ধার বা রিকভার করার জন্য ক্যালোরি ও পুষ্টির চাহিদা বেড়ে যায়। এর ফলে ক্ষুধার মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়; কিন্তু যেহেতু এটি স্বাভাবিক ক্ষুধার মতোই মনে হয়, তাই আপনি হয়তো অজান্তেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খেয়ে ফেলেন—যা শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত খাওয়ার (ওভার-ইটিং) সমস্যা তৈরি করে।
তিনি উল্লেখ করেন, “যখন আপনি খুব কঠোর ব্যায়াম করেন বা শরীরকে চরম সীমার দিকে ঠেলে দেন, তখন শরীর ক্ষুধার অনুভূতি বাড়িয়ে দিতে পারে। এত পরিশ্রমের পর শরীর চাপে পড়ে যায় এবং শক্তি ও পুষ্টির জন্য আকুল হয়ে ওঠে। তাই শরীর প্রাকৃতিকভাবেই আপনাকে বেশি ক্ষুধার্ত করে তোলে। আপনি বিষয়টি বুঝতে পারেন না; আপনার মনে হয় আপনি কেবল ক্ষুধা অনুযায়ীই খাচ্ছেন, কিন্তু বাস্তবে আপনি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি খাবার খেয়ে ফেলেন।” ফিটনেস কোচ উপসংহারে বলেন, “সাধারণ নিয়ম হলো, যখন মৌলিক বিষয়গুলো ঠিকঠাক থাকে না, তখন শরীর মানিয়ে নিতে হিমশিম খায়। তাই নিশ্চিত করুন যে আপনি পর্যাপ্ত ঘুমাচ্ছেন, প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন ও শাকসবজি খাচ্ছেন, পর্যাপ্ত জল পান করছেন এবং সবসময় আপনার প্রশিক্ষণের তীব্রতার দিকে নজর রাখছেন।”