অনেকেই মনে করেন সকালে ঘুম থেকে উঠে লেবু-জল পান করা অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর, কারণ এতে প্রচুর ভিটামিন সি থাকে এবং এটি হজমশক্তি ও শরীরের শক্তি বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। তবে চিকিৎসকরা সতর্ক করছেন যে, লেবু-জল সবার জন্য মানানসই নাও হতে পারে। মেডিকভার হসপিটালসের ২২ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন জেনারেল ফিজিশিয়ান ডা. প্রদীপ মিশ্র জানিয়েছেন, কিছু নির্দিষ্ট মানুষের ক্ষেত্রে এটি প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত করার আগে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
যারা অ্যাসিডিটি, গ্যাস, গ্যাস্ট্রোইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ (GERD) বা ঘন ঘন বুক জ্বালাপোড়ার সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত। লেবুতে প্রচুর পরিমাণে অ্যাসিড থাকে; খালি পেটে এটি পান করলে বুকে জ্বালাপোড়া, গলায় অস্বস্তি এবং পেটের সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে। যাঁদের আগে থেকেই গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত লেবু-জল পান করলে অস্বস্তি আরও বাড়তে পারে।
চিকিৎসকরা পাকস্থলীর আলসার বা গ্যাস্ট্রাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদেরও অতিরিক্ত লেবু-জল পান না করার পরামর্শ দেন। লেবুর অম্লীয় উপাদান পাকস্থলীর ভেতরের আস্তরণে (lining) আরও জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে, যার ফলে ব্যথা, জ্বালাপোড়া বা বমি বমি ভাব হতে পারে। হজমজনিত সমস্যায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের নিয়মিত লেবু-জল পানের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অতিরিক্ত মাত্রায় পান করলে লেবু-জল দাঁতের স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। লেবুতে থাকা সাইট্রিক অ্যাসিড ধীরে ধীরে দাঁতের এনামেলকে দুর্বল করে দিতে পারে, ফলে গরম বা ঠান্ডা খাবারের প্রতি দাঁত বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই স্ট্র-এর মাধ্যমে লেবু-জল পান করার এবং এরপর সাধারণ জল দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলার পরামর্শ দেন।
যারা মুখের আলসার বা ঘা-এর সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদেরও সতর্ক থাকা উচিত। লেবুর অম্লীয় উপাদান মুখের ভেতরের সংবেদনশীল অংশে জ্বালা ও অস্বস্তি বাড়িয়ে দিতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, আলসার পুরোপুরি সেরে না ওঠা পর্যন্ত লেবুজাতীয় ফল বা পানীয় গ্রহণ সাময়িকভাবে কমিয়ে দেওয়াই ভালো।
যাঁদের কিডনি-সংক্রান্ত স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে, তাঁদের অতিরিক্ত লেবু-জল পান করে নিজে নিজে চিকিৎসা করার চেষ্টা করা উচিত নয়। যদিও লেবু কিছু মানুষের উপকারে আসতে পারে, তবে সব ধরনের কিডনি সমস্যার ক্ষেত্রে এটি উপযুক্ত নাও হতে পারে; বিশেষ করে যারা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্দিষ্ট ডায়েট মেনে চলছেন।
আরও পড়ুন : SPF 30 বনাম SPF 50: ক্ষতিকর UV রশ্মি থেকে ত্বক রক্ষায় উচ্চতর SPF কি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এও উল্লেখ করেন যে, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে লেবুজাতীয় ফল মাইগ্রেনের মাথাব্যথা উসকে দিতে পারে। লেবু-জল পানের পর যদি মাথাব্যথা বেড়ে যায়, তবে বিশেষজ্ঞরা সেই লক্ষণ বা প্যাটার্নটির দিকে খেয়াল রাখার পরামর্শ দেন। চিকিৎসকরা আরও স্পষ্ট করেছেন যে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেক দাবি করা সত্ত্বেও, এমন কোনো জোরালো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই যা দিয়ে বলা যায় যে কেবল লেবু-জল পান করলেই শরীর পুরোপুরি ‘ডিটক্স’ বা বিষমুক্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লিভার ও কিডনির মতো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে শরীরের নিজস্ব ডিটক্স বা বিষমুক্তকরণ প্রক্রিয়া প্রাকৃতিকভাবেই কাজ করে। পরিমিত পরিমাণে লেবু-জল পান করা সাধারণত নিরাপদ বলে মনে করা হয়। যাদের আগে থেকেই কোনো শারীরিক সমস্যা রয়েছে, তাদের এটি দৈনন্দিন রুটিনে অন্তর্ভুক্ত করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।