আমাদের শরীরের স্বাভাবিক কার্যকারিতা বজায় রাখতে ভিটামিনগুলো বিশেষ ভূমিকা পালন করে। বি-কমপ্লেক্স হলো বিভিন্ন উপাদানের একটি সমষ্টিগত দল। বি১ (B1) থেকে শুরু করে বি১২ (B12) পর্যন্ত মোট আট ধরনের বি ভিটামিন রয়েছে। যদিও অধিকাংশ মানুষ মূলত বি১২-এর ওপরই বেশি গুরুত্ব দেন, তবুও এই দলের প্রতিটি উপাদানেরই নিজস্ব ও নির্দিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। আসুন, বি-কমপ্লেক্স দলের অন্তর্ভুক্ত ভিটামিনগুলোর নাম জেনে নিই এবং শরীরে এদের কাজগুলো বুঝে নিই।
অধিকাংশ বি-কমপ্লেক্স ভিটামিন নিরামিষ খাবারেই পাওয়া যায়, তবে কিছু ভিটামিনের জন্য ফর্টিফাইড (পুষ্টিসমৃদ্ধ) খাবার, আমিষ উৎস বা সাপ্লিমেন্টের প্রয়োজন হতে পারে। আসুন এখন আট ধরনের বি-কমপ্লেক্স ভিটামিন এবং কেন সেগুলোর প্রয়োজন, তা দেখে নেওয়া যাক।
ভিটামিন বি১ (Vitamin B1)
বি-কমপ্লেক্স দলের প্রথম ভিটামিনটি হলো বি১। বৈজ্ঞানিকভাবে এটি ‘থায়ামিন’ (thiamine) নামে পরিচিত। আমরা যে খাবার খাই, তাকে শক্তিতে রূপান্তরের মাধ্যমে এই ভিটামিন কাজ করে। এছাড়া, এটি আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের স্বাস্থ্য বজায় রাখতেও সহায়তা করে।
ভিটামিন বি২ (Vitamin B2)
বি-কমপ্লেক্স দলের দ্বিতীয় ভিটামিনটি হলো বি২, যা ‘রাইবোফ্লাভিন’ (riboflavin) নামে পরিচিত। এটি শরীরকে প্রোটিন, চর্বি ও কার্বোহাইড্রেট হজম করতে এবং সেগুলোকে শক্তিতে রূপান্তর করতে সহায়তা করে। পাশাপাশি, এটি চোখকে ছানি পড়া থেকে রক্ষা করে এবং ত্বককে সুস্থ ও উজ্জ্বল রাখতে সাহায্য করে। এটি মাথার স্নায়ুর ব্যথা ও প্রদাহ প্রতিরোধে সহায়তা করে, যার ফলে মাইগ্রেনের মতো সমস্যা থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়। এছাড়া ডিএনএ (DNA) মেরামতের জন্যও এটি একটি অপরিহার্য ভিটামিন।
ভিটামিন বি৩ (Vitamin B3)
ভিটামিন বি৩ বা ‘নিয়াসিন’ (niacin) হলো বি-কমপ্লেক্স দলের তৃতীয় ভিটামিন। এটি হজমশক্তি ও ত্বকের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটায়। এটি ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমাতে এবং উপকারী কোলেস্টেরল বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়া এটি অতিবেগুনি রশ্মি (UV rays) থেকে ত্বককে রক্ষা করে এবং অকালে বুড়িয়ে যাওয়া রোধে সহায়তা করে। পাশাপাশি, এটি মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি এবং হাড়ের জয়েন্টের ব্যথা ও প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
ভিটামিন বি৫ (Vitamin B5)
ভিটামিন বি৫ বা ‘প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড’ (pantothenic acid) হলো বি-কমপ্লেক্স দলের চতুর্থ ভিটামিন। এটি শরীরের হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং ত্বক ও চুলের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করে। এই ভিটামিনটি ব্রণ ও ক্ষত নিরাময়ে এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা কমাতে সহায়তা করে, যার ফলে হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো থাকে।
ভিটামিন বি৬ (Vitamin B6)
ভিটামিন বি৬ (পাইরিডক্সিন) হলো বি-কমপ্লেক্স গ্রুপের পঞ্চম ভিটামিন। এটি লোহিত রক্তকণিকা (RBC) তৈরিতে এবং প্রোটিন শোষণে সহায়তা করে। সুস্থ বিপাক প্রক্রিয়া বজায় রাখা থেকে শুরু করে মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়তা করা—সবক্ষেত্রেই এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এছাড়া এটি সেরোটোনিন ও ডোপামিনের মতো হরমোন তৈরিতে সাহায্য করে, যা মেজাজ বা মন ভালো রাখতে ভূমিকা রাখে।
ভিটামিন বি৭ (Vitamin B7)
ভিটামিন বি৭ বা বায়োটিন হলো বি-কমপ্লেক্স গ্রুপের ষষ্ঠ ভিটামিন—এমন একটি পুষ্টি উপাদান যার সাথে অধিকাংশ মানুষই পরিচিত। সুস্থ চুল, ত্বক ও নখ বজায় রাখার জন্য এটি অপরিহার্য। এর অভাবে চুল পড়া, ত্বকে লালচে র্যাশ বা ফুসকুড়ি এবং নখ দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। ডিএনএ ও জিনের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণেও এই ভিটামিনটি প্রয়োজন।
আরও পড়ুন : শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি হলে কি হয়? খাদ্যতালিকায় কি কি রাখা উচিত?
ভিটামিন বি৯ (Vitamin B9)
ফোলেট—যা ফলিক অ্যাসিড নামেও পরিচিত—হলো বি-কমপ্লেক্স ভিটামিনের অষ্টম ধরন (ভিটামিন বি৯) এবং গর্ভাবস্থায় এটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। এটি ভ্রূণের বিকাশে সহায়তা করে এবং ডিএনএ গঠন ও লোহিত রক্তকণিকা উৎপাদনে ভূমিকা রাখে। শরীরে হোমোসিস্টিন নামক অ্যামিনো অ্যাসিডের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে এটি হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।
ভিটামিন বি১২ (Vitamin B12)
ভিটামিন বি১২—যা কোবালামিন নামেও পরিচিত—হলো বি-কমপ্লেক্স গ্রুপের অষ্টম ও সর্বশেষ ভিটামিন; এটি মূলত প্রাণীজ খাবার এবং দুগ্ধজাত পণ্য থেকে পাওয়া যায়। এটি স্নায়ুতন্ত্র ও মস্তিষ্কের কোষগুলোকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে এবং ডিএনএ-র জন্য অপরিহার্য। এছাড়া হিমোগ্লোবিন তৈরির ক্ষেত্রেও এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন; এর অভাবে রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া হতে পারে।