সকালের নাস্তায় সেদ্ধ ডিম হোক কিংবা রাতের খাবারে গরম ভাতের সাথে ডিমের কারি—বাঙালি খাদ্যাভ্যাসে ডিম একটি অপরিহার্য উপাদান। এই ‘সুপারফুড’টি লিন প্রোটিন বা চর্বিহীন প্রোটিনের অন্যতম সেরা ও সাশ্রয়ী উৎস। তবুও ডিম খাওয়া নিয়ে বিতর্ক থেকেই গেছে। কেউ বলেন প্রতিদিন খেলে হৃদযন্ত্রের ক্ষতি হয়, আবার কেউ কুসুম এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন। ফলে মানুষের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে: সর্বোত্তম স্বাস্থ্যের জন্য প্রতিদিন কয়টি ডিম খাওয়া আদর্শ?
সম্প্রতি, আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাথে যুক্ত পুষ্টিবিদ ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা এমন কিছু যুগান্তকারী তথ্য প্রকাশ করেছেন যা ডিম সম্পর্কে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানায়।
ডিম নিয়ে এত সংশয় কেন?
একসময় ধারণা করা হতো যে ডিমের কুসুমে প্রচুর পরিমাণে কোলেস্টেরল থাকে, যা রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। তবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ভিন্ন কথা বলে। গবেষণায় দেখা গেছে, ডিমে থাকা কোলেস্টেরল (ডায়েটারি কোলেস্টেরল) সরাসরি রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের (এলডিএল বা LDL) মাত্রা বাড়ায় না। বরং শরীরে স্যাচুরেটেড ফ্যাট এবং ট্রান্স ফ্যাটের আধিক্যই কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ। প্রকৃতপক্ষে, ডিমের কুসুমে Omega-3 ফ্যাটি অ্যাসিড এবং ‘ভালো’ কোলেস্টেরল (এইচডিএল বা HDL) থাকে, যা হৃদযন্ত্রের স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়তা করে।
দিনে কয়টি ডিম খাওয়া নিরাপদ?
পুষ্টিবিদদের মতে, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি কোনো দ্বিধা ছাড়াই প্রতিদিন একটি থেকে দুটি আস্ত ডিম (কুসুমসহ) খেতে পারেন। যারা নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম করেন, জিমে যান বা ক্রীড়াবিদ, তাদের প্রোটিনের চাহিদা বেশি থাকে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তারা দিনে ৩-৪টি ডিম খেতে পারেন; তবে সেক্ষেত্রে ডিমের কুসুমের পরিমাণ কমিয়ে ডিমের সাদা অংশের ওপর জোর দেওয়াই শ্রেয়।
তবে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগের মতো দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সপ্তাহে ৩-৪টির বেশি ডিমের কুসুম না খাওয়াই ভালো। তারা চাইলে প্রতিদিন ডিমের সাদা অংশ নিরাপদে খেতে পারেন।
আরও পড়ুন : দাঁতের যত্ন: মাড়ি থেকে রক্ত পড়া উপেক্ষা করবেন না; বিশেষজ্ঞরা জানালেন ৫টি প্রধান কারণ
ডিমের পুষ্টিগুণ: কেন এটি খাবেন?
ডিমকে পুষ্টির এক ‘আধার’ বা ‘পাওয়ারহাউস’ বলা যেতে পারে। একটি পূর্ণাঙ্গ ডিমে থাকে উচ্চমানের প্রোটিন, যা পেশি গঠন ও ক্ষয়পূরণে সহায়তা করে। এতে রয়েছে কোলিন নামক একটি পুষ্টি উপাদান, যা মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বজায় রাখতে এবং স্মৃতিশক্তি বাড়াতে অপরিহার্য। এছাড়া ডিমে লুটেইন ও জিয়াজ্যানথিন নামক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট থাকে; এগুলো দৃষ্টিশক্তি ভালো রাখে এবং বয়সজনিত চোখের সমস্যা প্রতিরোধে সহায়তা করে। পাশাপাশি ডিমে ভিটামিন ডি, ভিটামিন B12, সেলেনিয়াম ও জিঙ্ক রয়েছে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
পুষ্টিবিদদের মতে, ডিমের পুষ্টিগুণ নির্ভর করে এটি কীভাবে রান্না করা হচ্ছে তার ওপর। অতিরিক্ত তেল-মসলা দিয়ে ডিমের কারি বা চিজ ও মাখন দিয়ে অমলেট তৈরি করলে ডিমের পুষ্টিগুণ কমে যেতে পারে এবং ক্যালোরি গ্রহণের পরিমাণ বেড়ে যায়। তাই ডিমের পূর্ণ পুষ্টি পেতে সেদ্ধ ডিম অথবা খুব সামান্য তেলে পোচ করা ডিম খাওয়াই সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর উপায়।