কিডনি আমাদের শরীরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ; রক্তপরিশোধন করা, শরীর থেকে বিষাক্ত বর্জ্য অপসারণ করা এবং শরীরের জল ও খনিজ উপাদানের ভারসাম্য বজায় রাখাই হলো এর প্রধান কাজ। তবে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান না করা এবং অনিয়মিত জীবনযাপনের কারণে কিডনি-সংক্রান্ত সমস্যাগুলো বর্তমানে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এমনই একটি সমস্যা হলো কিডনিতে পাথর—যা সাধারণত ‘পাথরি’ নামেই পরিচিত—এবং বর্তমানে সব বয়সের মানুষের মধ্যেই এই সমস্যাটি ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
অনেক সময়ই মানুষ কিডনিতে পাথর তৈরির পেছনের প্রকৃত প্রক্রিয়া বা কারণ সম্পর্কে অবগত থাকেন না। চলুন একজন বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে কিডনিতে পাথর তৈরির মূল কারণগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিই। পাশাপাশি, ওষুধ ব্যবহার না করেই কিডনির পাথর শরীর থেকে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব কি না—সে বিষয়েও জেনে নেওয়া যাক।
কিডনিতে পাথর তৈরির কারণ কি?
শ্রী বালাজি অ্যাকশন মেডিকেল ইনস্টিটিউটের নেফ্রোলজি বিভাগের পরিচালক ডা. রাজেশ আগরওয়াল জানান যে, কিডনিতে পাথর তৈরির পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ কারণটি হলো ডিহাইড্রেশন বা শরীরে জলের অভাব; যার ফলে প্রস্রাব অত্যধিক ঘন হয়ে যায় এবং খনিজ উপাদানগুলো জমাট বেঁধে পাথরের সৃষ্টি করে। এছাড়া লবণ, প্রোটিন এবং অক্সালেট-সমৃদ্ধ খাবার অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করলেও কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। পাশাপাশি, দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক সমস্যা—যেমন বারবার মূত্রনালীর সংক্রমণ (UTI) বা শরীরে ক্যালসিয়ামের ভারসাম্যহীনতা—এবং কিডনিতে পাথর হওয়ার পারিবারিক ইতিহাস কিংবা অলস ও কায়িক পরিশ্রমহীন জীবনযাপনও পাথর তৈরির পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সঠিক খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা, পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করা এবং একটি সুস্থ জীবনযাপন পদ্ধতি অনুসরণ করার মাধ্যমে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।
ওষুধ ছাড়াই কি কিডনির পাথর শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে পারে?
ডা. রাজেশ আগরওয়াল জানান যে, হ্যাঁ—ছোট আকারের কিডনি পাথর (যা প্রায় ৪-৫ মিমি পর্যন্ত হতে পারে) প্রায়শই কোনো ওষুধের প্রয়োজন ছাড়াই প্রাকৃতিক ভাবে মূত্রনালী দিয়ে শরীর থেকে বেরিয়ে যেতে পারে; বিশেষ করে যদি কেউ পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করেন। প্রতিদিন ২ থেকে ৩ লিটার জল পান করলে পাথরটি শরীর থেকে বের করে দিতে সুবিধা হয়। তবে, যদি পাথরটি আকারে বড় হয়, ব্যথা অত্যন্ত তীব্র হয়, অথবা প্রস্রাবের সাথে রক্ত দেখা যায়, তবে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বড় আকারের পাথরের ক্ষেত্রে অনেক সময় ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে কিংবা কোনো বিশেষ চিকিৎসাপদ্ধতির (medical procedures) আশ্রয় নিতে হতে পারে।
আরও পড়ুন : রাতে খাওয়ার সঠিক সময় কোনটি? জেনে নিন আয়ুর্বেদ ও বিজ্ঞান কি বলে
ঘরোয়া উপায়ে কি কিডনি পাথর শরীর থেকে বের করা সম্ভব?
বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করেন যে, ঠিক যেভাবে বেশি পরিমাণে জল পান করলে ওষুধ ছাড়াই ছোট পাথর বেরিয়ে যেতে সাহায্য পাওয়া যায়, তেমনি কিছু নির্দিষ্ট ঘরোয়া উপায়ও রয়েছে যা মূত্রনালী দিয়ে পাথর বের করে দিতে সহায়তা করতে পারে। এছাড়া, লেবুজল পান করাকেও উপকারী হিসেবে গণ্য করা হয়; কারণ এতে বিদ্যমান ‘সাইট্রেট’ উপাদানটি পাথর তৈরির প্রক্রিয়াকে ধীর করতে সাহায্য করতে পারে। অনেকে আবার ডাবের জল, বার্লির জল কিংবা তুলসী পাতা সেবন করেন, যা ঐতিহ্যগতভাবে কিডনির স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী বলে মনে করা হয়। তবে, আপনার দৈনন্দিন রুটিনে এই ঘরোয়া উপায়গুলো অন্তর্ভুক্ত করার আগে অবশ্যই আপনার চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।