শরীর, পিঠ বা পায়ে ত্বকের চুলকানি দূর করার জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শকৃত আয়ুর্বেদিক ঘরোয়া প্রতিকার সম্বন্ধে জানুন

পিঠ ও পায়ের চুলকানির সমস্যাটি একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং বিরক্তিকর উপদ্রব। এটি এক ধরণের ত্বকের অ্যালার্জি, যার চিকিৎসা করা কখনও কখনও বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। তবে, আয়ুর্বেদিক পদ্ধতিগুলো এক্ষেত্রে স্বস্তি এনে দিতে পারে। একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী, এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কিছু ঘরোয়া প্রতিকার আমরা আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।

5 Min Read

ত্বকে দীর্ঘস্থায়ী চুলকানি কখনও কখনও বিব্রতকর পরিস্থিতিরও সৃষ্টি করতে পারে। এর পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে; যার মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুষ্ক ত্বক, একজিমা, সোরিয়াসিস, ডায়াবেটিস, থাইরয়েডজনিত সমস্যা, লিভার বা কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতা, অতিরিক্ত ঘাম এবং মানসিক চাপ—এসব কিছুই পিঠ ও পায়ের চুলকানির উদ্রেক করতে পারে। বাড়িতে থাকাকালীন অনেকেই পিঠ চুলকানোর জন্য চিরুনি বা অনুরূপ কোনো বস্তুর সাহায্য নেন; কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা সমস্যার মূল কারণটি চিহ্নিত করতে কিংবা সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হন।

তবে, কিছু নির্দিষ্ট প্রথাগত ঘরোয়া প্রতিকার অবলম্বন করার মাধ্যমে চুলকানির সমস্যাটি অনেকটাই প্রশমিত করা সম্ভব। অবশ্য একথাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, যদি আপনার চুলকানির সমস্যাটি শরীরের অভ্যন্তরীণ কোনো গুরুতর অসুস্থতার লক্ষণ হয়ে থাকে, তবে অবশ্যই আপনাকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

পিঠ ও পায়ের চুলকানির চিকিৎসার জন্য বেশ কিছু আয়ুর্বেদিক পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। বাড়িতে বসেই কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব, জয়পুরের বিশিষ্ট আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞ ডা. কিরণ গুপ্ত এই বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। আসুন, সেই সহজ ও অত্যন্ত কার্যকর ঘরোয়া প্রতিকারগুলো সম্পর্কে আমরা আপনাদের জানাই…

শরীরে চুলকানির বৈজ্ঞানিক কারণসমূহ

চিকিৎসা বিজ্ঞানের পরিভাষায়, শরীরের যেকোনো অংশে চুলকানি অনুভূত হওয়াকে ‘প্রুরাইটাস’ (Pruritus) বলা হয়। এটি একটি অত্যন্ত সাধারণ সমস্যা, যার পাশাপাশি ত্বকে জ্বালাপোড়াও অনুভূত হতে পারে; অনেক ক্ষেত্রে এটি শরীরের অভ্যন্তরীণ কোনো গুরুতর অসুস্থতার পূর্বলক্ষণ হিসেবেও কাজ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি চুলকানির সমস্যাটি টানা ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে অব্যাহত থাকে, তবে তাকে ‘ক্রনিক প্রুরাইটাস’ বা দীর্ঘস্থায়ী চুলকানি হিসেবে গণ্য করা হয়। বাহ্যিক কারণগুলোর কথা বলতে গেলে, শুষ্ক ত্বক, অ্যালার্জি, পোকামাকড়ের কামড় কিংবা একজিমার মতো বিষয়গুলো এর জন্য দায়ী হতে পারে। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ কারণগুলোর মধ্যে লিভার বা কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতা এবং থাইরয়েডজনিত সমস্যাগুলো অন্যতম। যদি কোনো ব্যক্তি অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করেন এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ বা উদ্বেগে ভোগেন, তবে চুলকানির সমস্যাটি প্রায়শই একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হিসেবে দেখা দেয়—যার মূল কারণ হিসেবে অনেক ক্ষেত্রেই মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতিকে দায়ী করা হয়ে থাকে।

চুলকানি নিরাময়ে ঘরোয়া আয়ুর্বেদিক উপায়

জয়পুরের বিশিষ্ট আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞ কিরণ গুপ্ত পরামর্শ দিয়েছেন যে, ‘শিশম’ (Indian Rosewood) গাছের পাতার রস সেবন করার মাধ্যমে এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। তাছাড়া, ত্বকের যেসব নির্দিষ্ট অংশে চুলকানি হচ্ছে, সেখানে মুলতানি মাটি (Fuller’s Earth) বা মিহি মাটির তৈরি একটি পেস্ট বা প্রলেপ লাগানো উচিত। চাইলে আপনি এই পেস্টের সাথে হলুদ, কর্পূর এবং নিম পাতাও মিশিয়ে নিতে পারেন। এই আয়ুর্বেদিক প্রতিকারটি চুলকানি কমাতে সাহায্য করে এবং অ্যালার্জির সমস্যাকে আরও গুরুতর হয়ে ওঠা থেকে রক্ষা করে। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, অতিরিক্ত ভাজাভুজি ও তৈলাক্ত খাবার খেলে শরীরের অভ্যন্তরে অম্লত্ব বা অ্যাসিডিটির মাত্রা বেড়ে যায়, যার ফলে চুলকানি বা অ্যালার্জির সমস্যা দেখা দেওয়াটা প্রায় অনিবার্য হয়ে ওঠে।

আরও পড়ুন : কোন ভিটামিন ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে? একজন বিশেষজ্ঞের কাছে জানুন

গ্রীষ্মকালে ত্বকের সমস্যাগুলো বিশেষত কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে; তাই এই সময়ে পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করা অত্যন্ত জরুরি। গ্রীষ্মকালে শরীরকে সতেজ ও আর্দ্র রাখতে ডা. গুপ্ত শসা এবং তরমুজের মতো জলসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেন। আপনি চাইলে ‘ঠান্ডাই’ (Thandai) বা গোলাপের শরবতও পান করতে পারেন; কারণ এগুলো শরীরের ভেতর থেকে শীতলতা প্রদান করে ত্বককে অ্যালার্জির হাত থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করে।

নারকেল তেল ও কর্পূরের প্রতিকার: ডা. গুপ্ত পরামর্শ দেন যে, প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে পা এবং পিঠে কর্পূর মেশানো নারকেল তেল মাখা উচিত। এই উপাদানগুলো অধিকাংশ বাড়িতেই সহজলভ্য এবং এগুলো ব্যবহার করাও বেশ সহজ। বিকল্প হিসেবে, আপনি নারকেল তেলের সাথে অ্যালোভেরা জেল মিশিয়েও ব্যবহার করতে পারেন। এই আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞ জোর দিয়ে বলেন যে, যদি চুলকানির সমস্যা বেশ কয়েক মাস ধরে চলতে থাকে, তবে আপনার যকৃৎ (লিভার) এবং বৃক্কের (কিডনি) অবস্থা পরীক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় রোগনির্ণয়মূলক পরীক্ষাগুলো করিয়ে নেওয়া উচিত। পাশাপাশি, থাইরয়েড-সংক্রান্ত পরীক্ষাগুলো করানোও অপরিহার্য। এর কারণ হলো—আপনি মাটির প্রলেপ বা অন্য যেকোনো আয়ুর্বেদিক প্রতিকারই ব্যবহার করুন না কেন—যদি শরীরের অভ্যন্তরে কোনো সুপ্ত শারীরিক সমস্যা থেকে থাকে, তবে এই বাহ্যিক প্রতিকারগুলোর কার্যকারিতা অনেকটাই কমে যায়।

Share This Article