মদ্যপান না করা সত্ত্বেও লিভারের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটছে কেন? জানুন

বর্তমান সময়ে, যারা মদ্যপান থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকেন, তারাও লিভার-সংক্রান্ত রোগের শিকার হচ্ছেন। এমতাবস্থায়, মদ্যপান না করা সত্ত্বেও কেন লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে—তা বোঝা অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। চলুন, ডা. এল.এইচ. ঘোটেকারের সাথে এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।

4 Min Read

আজকাল লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, যারা মদ্যপান করেন না—এমন ব্যক্তিদের মধ্যেও লিভার-সংক্রান্ত সমস্যাগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেকেই এতে হতবাক হয়ে ভাবছেন—তারা তো জীবনে কখনোই মদ্যপান করেননি, তাহলে তাদের লিভার কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে? প্রাথমিকভাবে লিভারের সমস্যার লক্ষণগুলো বেশ মৃদু বা সামান্য থাকে, যার ফলে মানুষ সেগুলোকে উপেক্ষা করে চলে। ধীরে ধীরে শরীরে একটানা ক্লান্তি অনুভূত হতে থাকে, ক্ষুধা কমে যায় এবং পেটের ডান দিকে এক ধরণের ভারী ভাব অনুভূত হয়। কেউ কেউ গ্যাস, বদহজম, বমি বমি ভাব কিংবা ওজন বৃদ্ধির মতো সমস্যার কথাও জানিয়ে থাকেন।

এ ছাড়াও, ত্বক ও চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া, প্রস্রাবের রং গাঢ় হয়ে যাওয়া এবং পায়ে জল আসা বা ফুলে যাওয়ার মতো লক্ষণগুলোও প্রকাশ পেতে পারে। এই সমস্ত লক্ষণই নির্দেশ করে যে, লিভার তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে বা ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না। তাই, যারা মদ্যপান করেন না—তাদের জন্যও লিভারের স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হওয়া কেন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, তা বোঝা অত্যন্ত জরুরি।

মদ্যপান ছাড়াই লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণগুলো কি কি?

লেডি হার্ডিঞ্জ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের পরিচালক ও প্রধান ডা. এল.এইচ. ঘোটেকার ব্যাখ্যা করেন যে, মদ্যপান ছাড়াও আরও বেশ কিছু কারণ রয়েছে যা লিভারের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার এবং ফাস্ট ফুড বা ‘জাঙ্ক ফুড’ গ্রহণ লিভারের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করে। শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং ওজন বৃদ্ধিও লিভার-সংক্রান্ত জটিলতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন ওষুধ সেবন—বিশেষ করে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ খাওয়া—লিভারের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

এ ছাড়াও, বিভিন্ন ভাইরাল সংক্রমণ এবং দূষিত জল বা খাবারের মাধ্যমে ছড়ানো রোগগুলোও লিভারকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। মানসিক চাপ, অনিয়মিত জীবনযাপন এবং পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব শরীরের বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজমকে ব্যাহত করে; যার নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত লিভারের ওপরই এসে পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে, পারিবারিক ইতিহাস বা আগে থেকেই শরীরে বিদ্যমান কোনো শারীরিক অসুস্থতাও লিভারের স্বাস্থ্যের অবনতির কারণ হতে পারে।

কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন?

নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি লিভার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বা লিভারের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে অন্যদের তুলনায় অধিক ঝুঁকিতে থাকেন। যারা স্থূলতার সমস্যায় ভুগছেন, পাশাপাশি ডায়াবেটিস বা থাইরয়েডজনিত সমস্যায় আক্রান্ত রোগীরাও লিভারের ঝুঁকির ক্ষেত্রে অধিকতর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। যারা শারীরিক পরিশ্রমহীন বা অলস জীবনযাপন করেন, কিংবা যারা প্রায়শই বাইরের খাবার গ্রহণ করেন—তাদের ক্ষেত্রেও এই ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

যারা দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন ওষুধ সেবন করছেন, এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল—তারাও লিভার-সংক্রান্ত সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। তাছাড়া, যাদের পারিবারিক ইতিহাসে লিভার রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদেরও এ বিষয়ে সর্বদা সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন : সকালে ওঠার পর কোন অভ্যাসগুলো হৃদপিণ্ডের জন্য উপকারী, জানুন

কীভাবে আপনার লিভারকে সুরক্ষিত রাখবেন?

লিভারকে সুস্থ রাখতে হলে, ঘরে তৈরি খাবারসমৃদ্ধ একটি সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা অপরিহার্য। ভাজাভুজি, অতিরিক্ত তেলযুক্ত এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন। প্রতিদিন হালকা ব্যায়াম বা হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন। পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করুন এবং সময়মতো খাবার গ্রহণ নিশ্চিত করুন।

চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো প্রকার ওষুধ সেবন করা থেকে বিরত থাকুন। আপনার শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। মানসিক চাপ বা স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে রাখতে যোগব্যায়াম ও ধ্যানের চর্চা করুন। এই সহজ অভ্যাসগুলো মেনে চলার মাধ্যমে আপনি দীর্ঘমেয়াদে আপনার লিভারের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পারেন।

Share This Article