গ্লুকোমার লক্ষণগুলো কি কি? চোখের এই রোগটি কতটা বিপজ্জনক? জানুন

গ্লুকোমা হলো চোখের একটি গুরুতর রোগ যা দৃষ্টিশক্তি নষ্ট করে দিতে পারে। যদি সঠিক সময়ে রোগটি শনাক্ত করা না হয় এবং যথাযথ চিকিৎসা না করা হয়, তবে এই অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটতে পারে। আসুন, ডা. এ.কে. গ্রোভারের কাছ থেকে এই রোগের কারণ, লক্ষণ এবং প্রতিরোধের উপায় সম্পর্কে জেনে নিই।

4 Min Read

গ্লুকোমা চোখের সাথে সম্পর্কিত একটি গুরুতর অবস্থা যা ধীরে ধীরে মানুষের দৃষ্টিশক্তিকে প্রভাবিত করে। এই রোগে চোখের ভেতরের চাপ (intraocular pressure) বাড়তে শুরু করে, যার ফলে চোখের অপটিক নার্ভ বা দৃষ্টিবাহী স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অপটিক নার্ভ হলো সেই স্নায়ু যা চোখ দ্বারা গৃহীত দৃশ্যমান সংকেতগুলোকে মস্তিষ্কে পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে। যখন এই স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন মানুষের দৃষ্টিশক্তি ধীরে ধীরে ক্ষীণ হতে শুরু করে। অনেক সময়, রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ বা অস্বস্তি ছাড়াই এই রোগ নীরবে বাড়তে থাকে।

বয়স বৃদ্ধি, পরিবারে গ্লুকোমার ইতিহাস থাকা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং দীর্ঘ সময় ধরে নির্দিষ্ট কিছু ওষুধের ব্যবহার এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। এছাড়া, চোখে আঘাত পাওয়া কিংবা চোখের ভেতরের চাপ অত্যধিক বেড়ে যাওয়াও এই রোগের পেছনে সহায়ক কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে। সময়মতো চোখের পরীক্ষা করানো এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই রোগকে অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তাই, এই রোগের লক্ষণগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানা অত্যন্ত জরুরি। আসুন, আমরা সেই লক্ষণগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করি।

গ্লুকোমার লক্ষণগুলো কি কি?

স্যার গঙ্গা রাম হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের সাবেক প্রধান ডা. এ.কে. গ্রোভার জানান যে, গ্লুকোমার লক্ষণগুলো রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে সবসময় স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না; ফলে অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই রোগটি শনাক্ত হতে বেশ দেরি হয়ে যায় এবং তারা রোগের পরবর্তী পর্যায়ে এসে ধরা পড়েন। ধীরে ধীরে রোগীর দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হতে থাকে এবং তার দেখার পরিধি বা ক্ষেত্র (field of view) ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসতে পারে। অনেক সময় রোগীরা তাদের দৃষ্টিসীমার প্রান্তভাগে বা পার্শ্ববর্তী অংশে স্পষ্টভাবে দেখতে অসুবিধা বোধ করেন—চিকিৎসার পরিভাষায় এই অবস্থাকে ‘টানেল ভিশন’ (tunnel vision) বলা হয়ে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে, রোগীরা চোখে ব্যথা, মাথাব্যথা কিংবা চোখের ভেতর ভারী ভারী ভাব অনুভব করতে পারেন।

উজ্জ্বল আলোর চারপাশে রঙিন বলয় বা বৃত্তাকার আভা দেখতে পাওয়াও এই রোগের একটি সম্ভাব্য লক্ষণ হতে পারে। চোখ লাল হয়ে যাওয়া, দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসা কিংবা দৃষ্টিশক্তির আকস্মিক অবনতি ঘটাও এই রোগের লক্ষণগুলোর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। যদি কোনো ব্যক্তি এ ধরনের লক্ষণ অনুভব করেন, তবে অবিলম্বে একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি, যাতে সঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়।

গ্লুকোমা কতটা বিপজ্জনক?

গ্লুকোমাকে চোখের একটি গুরুতর রোগ হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ এটি ধীরে ধীরে এবং স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি নষ্ট করে দিতে পারে। যদি এই রোগটি শনাক্ত না করা হয় এবং এর চিকিৎসা না করা হয়, তবে এর ফলে দৃষ্টিশক্তির ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।

অনেক ক্ষেত্রেই, এর পরিণতি হিসেবে সম্পূর্ণ অন্ধত্বও নেমে আসতে পারে। এই রোগের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, এর প্রাথমিক লক্ষণগুলো অত্যন্ত মৃদু হয়; ফলে মানুষ প্রায়শই সেগুলোকে উপেক্ষা করে থাকে। তবে, যখন সমস্যাটি স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে, ততক্ষণে অপটিক স্নায়ুর (optic nerve) ইতিমধ্যেই ব্যাপক ক্ষতি হয়ে গেছে। তাই, নিয়মিত চক্ষু পরীক্ষা করানোকে অত্যন্ত জরুরি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আরও পড়ুন : শিশুদের প্রোটিন ঘাটতির লক্ষণ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে জানুন

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো কি কি?

গ্লুকোমা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে নিয়মিত চক্ষু পরীক্ষাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা হয়। বিশেষ করে, ৪০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট সময় অন্তর চোখের পরীক্ষা করানো উচিত। যদি পরিবারে এই রোগের ইতিহাস থাকে, তবে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা আরও বেশি অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, চোখের ড্রপ, মুখে সেবনের ওষুধ অথবা—প্রয়োজন সাপেক্ষে—অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এই রোগটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এছাড়া, একটি সুস্থ জীবনযাপন বজায় রাখা এবং রক্তচাপ ও রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা চোখের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

Share This Article