আমাদের শরীরের জন্য ক্যালসিয়াম অত্যন্ত অপরিহার্য; আমাদের দাঁত থেকে শুরু করে হাড়—সবকিছুর শক্তি বজায় রাখতে এটি এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে, কিছু নির্দিষ্ট শারীরিক অসুস্থতার কারণে মাঝেমধ্যে শরীরের ক্যালসিয়ামের মাত্রা ধীরে ধীরে কমে যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় এই অবস্থাকে ‘হাইপোক্যালসেমিয়া’ (Hypocalcemia) বলা হয়। আসুন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করি এবং জেনে নিই—কোন কোন রোগের কারণে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দেখা দেয়, এর লক্ষণগুলো কি এবং কীভাবে এর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।
লেডি হার্ডিঞ্জ মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের ডা. এল.এইচ. ঘোটেকার ব্যাখ্যা করেন যে, শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দেখা দিলে তা নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে হাড় দুর্বল হয়ে যাওয়া, পেশিতে ব্যথা, হাড়ের জোড়া বা গাঁট নড়াচড়ার সময় ‘ক্লিক’ বা মটমট শব্দ হওয়া এবং সামান্য আঘাতেও তীব্র ব্যথা অনুভব করা। শরীরে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দেখা দেওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো ভিটামিন ‘ডি’-এর অভাব।
কোন কোন রোগের কারণে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দেখা দেয়?
ডা. এল.এইচ. ঘোটেকার উল্লেখ করেন যে, বিভিন্ন ধরনের শারীরিক জটিলতা থেকে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এর সবচেয়ে সাধারণ কারণ হিসেবে ধরা হয় ভিটামিন ‘ডি’-এর অভাবকে; কারণ ভিটামিন ‘ডি’-ই শরীরে ক্যালসিয়ামের সঠিক শোষণ বা গ্রহণ নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। এছাড়া, কিডনি বা বৃক্ক-সংক্রান্ত রোগগুলোও ক্যালসিয়ামের মাত্রার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে; যদি কিডনি সঠিকভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হয়, তবে শরীরের খনিজ উপাদানের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
থাইরয়েড এবং প্যারাথাইরয়েড গ্রন্থি-সংক্রান্ত সমস্যাগুলোও ক্যালসিয়ামের ঘাটতি সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারে। পরিপাকতন্ত্রের কিছু নির্দিষ্ট সমস্যা—যেমন অন্ত্রের মাধ্যমে পুষ্টি উপাদান সঠিকভাবে শোষিত না হওয়া—শরীরে ক্যালসিয়াম ক্ষয়ের সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। তাছাড়া, দীর্ঘ সময় ধরে নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ সেবন করার ফলেও ক্যালসিয়ামের মাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই, এই অন্তর্নিহিত শারীরিক সমস্যাগুলোকে যথাসময়ে শনাক্ত করা এবং সেগুলোর উপযুক্ত চিকিৎসা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।
ক্যালসিয়ামের ঘাটতির লক্ষণগুলো কীভাবে প্রকাশ পায়?
শরীরে ক্যালসিয়ামের মাত্রা যখন কমতে শুরু করে, তখন বেশ কিছু সতর্কসূচক লক্ষণ বা উপসর্গ প্রকাশ পেতে পারে। এই অবস্থার একটি সাধারণ লক্ষণ হলো হাড়ের ভেতর এক ধরনের দুর্বলতা বা শিথিলতা অনুভব করা। অনেক ব্যক্তি পেশিতে ব্যথা অথবা পেশির হঠাৎ সংকোচন বা খিঁচুনিও অনুভব করতে শুরু করেন। এছাড়া, হাড়ের জোড়া বা গাঁটে ব্যথা, ক্লান্তি এবং সামগ্রিক শারীরিক দুর্বলতাও অনুভূত হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে, এমনকি সামান্য আঘাতও অত্যধিক ব্যথা বা অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। দাঁতের দুর্বলতা কিংবা দাঁত ও মাড়ির বারবার দেখা দেওয়া সমস্যাগুলোও ক্যালসিয়ামের অভাবের লক্ষণ হতে পারে। যদি এই লক্ষণগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বজায় থাকে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে শারীরিক পরীক্ষা করানো অত্যন্ত জরুরি, যাতে সঠিক সময়ে উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করা সম্ভব হয়।
আরও পড়ুন : সবার জন্যই কি ৮ ঘণ্টা ঘুম জরুরি? একজন বিশেষজ্ঞের কাছে জানুন
এটি কীভাবে প্রতিরোধ করবেন?
ক্যালসিয়ামের অভাব প্রতিরোধের জন্য একটি সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিনের খাবারে দুধ, দই, পনির এবং সবুজ শাকসবজি অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত উপকারী। তাছাড়া, ক্যালসিয়াম শোষণের জন্য ভিটামিন ‘ডি’ অপরিহার্য; তাই প্রতিদিন কিছুটা সময় সূর্যের আলোতে কাটানো বেশ হিতকর বলে মনে করা হয়।
হাড় মজবুত রাখার ক্ষেত্রে নিয়মিত শরীরচর্চা এবং একটি কর্মচঞ্চল জীবনযাত্রাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যদি কোনো ব্যক্তি ক্যালসিয়ামের তীব্র অভাবে ভোগেন, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তিনি ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট বা পরিপূরক গ্রহণ করতে পারেন।