ঘুম আমাদের জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি কেবল বিশ্রামের সময় নয়, বরং শরীর ও মন—উভয়কেই সতেজ ও পুনরুজ্জীবিত করার একটি প্রক্রিয়া। যখন আমরা পর্যাপ্ত ঘুমাই, তখন শারীরিক ক্লান্তি দূর হয়ে যায় এবং আমাদের পেশি ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো তাদের প্রয়োজনীয় বিশ্রামটুকু পায়। মানসিক দিক থেকে বলতে গেলে, ঘুম স্মৃতিশক্তিকে জোরদার করে, শেখার ও চিন্তাশক্তির ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। ভালো ঘুম আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়িয়ে তোলে, যার ফলে অসুস্থতার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য শরীরের সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। সাধারণত ৮ ঘণ্টা ঘুমকেই পর্যাপ্ত বলে মনে করা হয়, কারণ এই সময়ের ঘুম শরীর ও মন—উভয়কেই পুরোপুরি চাঙ্গা করে তুলতে সাহায্য করে।
পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবের ফলে দিনের বেলা ক্লান্তি, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া এবং কাজে মনোযোগ দিতে অসুবিধা হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এটি মানসিক চাপ এবং শারীরিক দুর্বলতাকেও বাড়িয়ে তুলতে পারে। সঠিক পরিমাণে ঘুমালে শরীরের শক্তির মাত্রা বজায় থাকে এবং সারাদিন ধরে সচল ও কর্মচঞ্চল থাকা সম্ভব হয়। তাই, শারীরিক ও মানসিক—উভয় ধরনের সুস্থতার জন্যই ঘুমের একটি সঠিক সময়সূচি তৈরি করা এবং পর্যাপ্ত সময় ধরে ঘুমানো অত্যন্ত জরুরি। চলুন এবার জেনে নেওয়া যাক, ৮ ঘণ্টা ঘুম সত্যিই সবার জন্য একটি আবশ্যিক প্রয়োজন কি না।
সবার জন্যই কি ৮ ঘণ্টা ঘুম জরুরি?
আরএমএল (RML) হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের পরিচালক ও অধ্যাপক ডা. সুভাষ গিরি ব্যাখ্যা করেন যে, যদিও প্রায়শই বলা হয়ে থাকে যে সবারই প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা ঘুমানো উচিত, কিন্তু বাস্তবে একেকজনের ঘুমের প্রয়োজনীয়তা একেকরকম হয়ে থাকে। এই প্রয়োজনীয়তাগুলো বয়স, জীবনযাপন পদ্ধতি, শারীরিক পরিশ্রমের মাত্রা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের অবস্থার মতো বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের সাধারণত বেশি ঘুমের প্রয়োজন হয়, কারণ তাদের মস্তিষ্ক ও শরীর তখনো বিকাশের পর্যায়ে থাকে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সাধারণত ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমকেই পর্যাপ্ত বলে মনে করা হয়।
যাদের পেশাগত দায়িত্ব অত্যন্ত কঠিন বা পরিশ্রমসাধ্য—বিশেষ করে যারা কঠোর মানসিক কিংবা শারীরিক পরিশ্রমের কাজে যুক্ত—তাদের মাঝেমধ্যে স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি ঘুমের প্রয়োজন হতে পারে। এর বিপরীতে, এমন অনেক মানুষও আছেন যারা অপেক্ষাকৃত কম সময় ঘুমানোর পরেও পুরোপুরি সচল ও কর্মক্ষম থাকতে পারেন। পরিশেষে বলা যায়, ঘুমের সময়সীমা কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট সংখ্যার লক্ষ্যমাত্রার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা উচিত নয়; বরং নিজের শরীর ও মনের সুনির্দিষ্ট চাহিদার ওপর ভিত্তি করেই তা ঠিক করা উচিত। তাই, প্রতিটি মানুষেরই উচিত নিজের ঘুমের অভ্যাস এবং প্রয়োজনীয়তার ওপর ভিত্তি করে একটি সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা।
অত্যধিক কম বা বেশি ঘুমের ক্ষতিকর প্রভাব
পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম না হওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। ঘুমের পরিমাণ অপর্যাপ্ত হলে একজন ব্যক্তি ক্লান্তি, মনোযোগের অভাব, মেজাজের আকস্মিক পরিবর্তন এবং মানসিক চাপের সম্মুখীন হতে পারেন। দীর্ঘস্থায়ী ঘুমের অভাব হৃদরোগ, স্থূলতা, ডায়াবেটিস এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাধির মতো গুরুতর শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ঘুমানোও ক্ষতিকর। অতিরিক্ত ঘুম অলসতা, শারীরিক শক্তির অভাব এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিষণ্নতার মতো সমস্যাগুলোকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। ঘুমের পরিমাণ এবং গুণমান—উভয়ের মধ্যেই ভারসাম্য বজায় রাখা আবশ্যক। আপনার শরীরের সুনির্দিষ্ট চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিমাণ ঘুম নিশ্চিত করা আপনার শারীরিক স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য।
আরও পড়ুন : গ্রীষ্মের তীব্র রোদ থেকে চুলকে রক্ষা করতে কিভাবে যত্ন নেবেন জানুন
ঘুমের গুণমানের গুরুত্ব
কেবল প্রয়োজনীয় সংখ্যক ঘণ্টা ঘুমালেই যথেষ্ট হয় না; সেই ঘুমের গুণমানও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গভীর ও নিরবচ্ছিন্ন ঘুম শরীর ও মনকে সম্পূর্ণরূপে সতেজ ও পুনরুজ্জীবিত করে তোলে। অগভীর বা খণ্ড-বিখণ্ড ঘুম—যা বারবার ব্যাঘাত ঘটার দ্বারা চিহ্নিত—তা ক্লান্তি দূর করতে বা মানসিক চাপ কমাতে খুব একটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।
ভালো ঘুম নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত সময়ে ঘুমাতে যাওয়া, ঘুমানোর আগে মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন স্ক্রিন ব্যবহার থেকে বিরত থাকা এবং ঘুমানোর জন্য একটি শান্ত ও আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করা অপরিহার্য। এই অভ্যাসগুলো শরীরকে কার্যকর ভাবে বিশ্রাম নিতে সহায়তা করে এবং সারাদিন ধরে শারীরিক শক্তির মাত্রা অটুট রাখতে নিশ্চিত ভূমিকা পালন করে।