বর্ষাকালে সাধারণ মূত্রনালীর সংক্রমণ বা ইউটিআই (UTI)-কে হালকাভাবে নেওয়াটা অনেক সময় বিপদ ডেকে আনতে পারে। শুরুতে এটি হয়তো সামান্য সমস্যা মনে হতে পারে—যেমন প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ বা তলপেটে হালকা ব্যথা। কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা না করা হলে সংক্রমণটি কিডনি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং গুরুতর আকার ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে কম বয়সী মেয়েদের ক্ষেত্রে অবহেলার ফলে মারাত্মক পরিণতি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেন যে, নারী ও মেয়েরা প্রায়ই ভেজা কাপড় পরে থাকা বা পর্যাপ্ত জল পান না করার মতো ভুলগুলো করে থাকেন। বর্ষাকালে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি থাকে এবং এ ধরনের অবহেলা বড় ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। আসুন চিকিৎসকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ইউটিআই(UTI)-এর প্রধান কারণ ও প্রতিরোধের উপায়গুলো জেনে নিই…
কেন মূত্রনালীর সংক্রমণ হয়?
ডা. মনীষা অরোরা (পরিচালক, ইন্টারনাল মেডিসিন, সিকে বিড়লা হাসপাতাল)-এর মতে, দীর্ঘ সময় ভেজা কাপড় পরে থাকা, পর্যাপ্ত জল পান না করা এবং বৃষ্টিতে ভেজার পর পরিচ্ছন্নতা বজায় না রাখার ফলে বর্ষাকালে ব্যাকটেরিয়া বংশবৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। এর ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। উচ্চ জ্বর, কাঁপুনি, কোমরের নিচের অংশের একপাশে তীব্র ব্যথা, বমি বা অত্যধিক দুর্বলতার মতো লক্ষণগুলো ইঙ্গিত দিতে পারে যে সংক্রমণ কিডনি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে ঘরোয়া টোটকা বা নিজে নিজে ওষুধ খাওয়ার ওপর নির্ভর না করে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। সময়মতো প্রস্রাবের রুটিন পরীক্ষা ও ইউরিন কালচার পরীক্ষার মাধ্যমে সংক্রমণ শনাক্ত করা হয় এবং সেই অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। আশার কথা হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে অধিকাংশ ইউটিআই(UTI)-এর চিকিৎসা সহজেই করা সম্ভব এবং এর মাধ্যমে গুরুতর জটিলতা প্রতিরোধ করা যায়।
বর্ষাকালে UTI-এর প্রকোপ বৃদ্ধি
ডা. সি.এস. মিত্রেয়ী (সিনিয়র কনসালট্যান্ট, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ) জানান যে, নারীদের মূত্রনালীর সংক্রমণের কারণ সরাসরি বৃষ্টি নয়, বরং এই ঋতু-সম্পর্কিত কিছু অভ্যাস ও পরিস্থিতি। উচ্চ আর্দ্রতা, ঘাম, দীর্ঘ সময় ভেজা কাপড় পরে থাকা, কম জল পান করা এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাব ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। বর্ষাকালে তৃষ্ণা কম অনুভূত হওয়ায় অনেকেই জল কম পান করেন; এর ফলে প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যায় এবং মূত্রনালিতে ব্যাকটেরিয়া সহজেই টিকে থাকতে পারে।
আরও পড়ুন : তামাক বা ধূমপান ছাড়ার ৪টি উপায় এবং ৬টি সতর্কবার্তা যা উপেক্ষা করা উচিত নয়
লক্ষণ ও চিকিৎসা
প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ, দুর্গন্ধযুক্ত বা ঘোলাটে প্রস্রাব এবং কখনও কখনও প্রস্রাবের সাথে রক্ত বেরিয়েযাওয়া। এছাড়া উচ্চ জ্বর, কাঁপুনি, কোমরের নিচের দিকে ব্যথা, বমি বমি ভাব বা বমির মতো গুরুতর জটিলতাও দেখা দিতে পারে। গর্ভবতী নারী, ডায়াবেটিস রোগী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তিদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। সময়মতো রোগ নির্ণয়, সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক সেবন এবং পর্যাপ্ত পানি জল করা—এই বিষয়গুলো সংক্রমণকে গুরুতর আকার ধারণ করা থেকে রোধ করতে অত্যন্ত কার্যকর।
কিডনি সংক্রমণের ঝুঁকি
আকাশ হেলথকেয়ার মাল্টি-স্পেশালিটি হাসপাতালের নেফ্রোলজি ও কিডনি প্রতিস্থাপন বিভাগের প্রধান পরিচালক ডা. বিক্রম কালরার মতে, মানুষ প্রায়ই মনে করেন যে মূত্রনালির সংক্রমণ (UTI) নিজে থেকেই সেরে যাবে; কিন্তু এই ধরনের অবহেলার কারণে সংক্রমণটি অনেক সময় কিডনি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। বর্ষাকাল সরাসরি ইউটিআই (UTI)-এর কারণ না হলেও, এই সময়ের আর্দ্রতা, উষ্ণতা এবং বিশেষ কিছু জীবনযাত্রার অভ্যাসের কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অধিকাংশ ইউটিআই(UTI) সংক্রমণের জন্য ই. কোলাই(E. coli) ব্যাকটেরিয়া দায়ী।