গর্ভপাতের পর একজন নারীর শরীরে নানাবিধ শারীরিক ও হরমোনজনিত পরিবর্তন ঘটে। এই সময়ে জরায়ুর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার জন্য সময়ের প্রয়োজন হয় এবং শরীরেরও সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য সময় দরকার হয়। সঠিক পরিচর্যার অভাবে সংক্রমণ, অতিরিক্ত রক্তপাত, শারীরিক দুর্বলতা এবং অন্যান্য জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। এই সময়ে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কিছুটা সংবেদনশীল থাকে; তাই ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া একান্ত অপরিহার্য। এছাড়া, এই পর্যায়ে একজন নারী মানসিক অবস্থার পরিবর্তন বা আবেগজনিত অস্থিরতার সম্মুখীন হতে পারেন। বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন যে, গর্ভপাতের পরবর্তী সঠিক পরিচর্যা কেবল সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াকেই ত্বরান্বিত করে না, বরং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতেও সহায়তা করে।
এই প্রেক্ষাপটে, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা, সময়মতো ওষুধ সেবন করা এবং পরবর্তী ফলো-আপ বা পুনরায় পরীক্ষার জন্য চিকিৎসকের কাছে যাওয়া—এই পুরো প্রক্রিয়ারই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি শরীরের সঠিক নিরাময় প্রক্রিয়াকে সহজতর করে এবং নিশ্চিত করে যে, কোনো জটিলতা দেখা দিলে তা যেন সঠিক সময়ে শনাক্ত করা যায়। এই সময়ে সামান্য অবহেলাও স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই, গর্ভপাতের পর নারীদের ঠিক কোন ভুলগুলো এড়িয়ে চলা উচিত, তা সঠিকভাবে বুঝে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
গর্ভপাতের পর নারীদের কোন ভুলগুলো এড়িয়ে চলা উচিত?
আরএমএল (RML) হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সালোনি চাড্ডা ব্যাখ্যা করেন যে, গর্ভপাতের পর কেউ যে সবচেয়ে বড় ভুলটি করতে পারেন, তা হলো অতিরিক্ত পরিশ্রম বা কঠোর শারীরিক কসরত করা। এর ফলে রক্তপাতের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন করা—কিংবা চিকিৎসক কর্তৃক নির্দেশিত ওষুধের পূর্ণ কোর্স সম্পন্ন না করা—শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অনেক নারীই ব্যথা, সামান্য জ্বর বা অস্বাভাবিক রক্তপাতের মতো লক্ষণগুলোকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে উপেক্ষা করার প্রবণতা দেখান, যা একটি ভুল পদক্ষেপ।
ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে অবহেলা করা কিংবা দীর্ঘক্ষণ ভেজা কাপড় পরে থাকা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে। চিকিৎসক কর্তৃক নির্দেশিত বিশ্রামের সময়টুকু উপেক্ষা করা এবং পরবর্তী ফলো-আপ চেক-আপগুলো বাদ দেওয়াও সাধারণ ভুল হিসেবে গণ্য হয়। এছাড়া, মানসিক চাপ চেপে রাখা বা মানসিক সহায়তার জন্য কারো সাহায্য না চাওয়াও সুস্থ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়াকে ধীরগতিসম্পন্ন করে তুলতে পারে। শরীরকে সঠিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিতে হলে এই ভুলগুলো এড়িয়ে চলা একান্ত প্রয়োজন।
গর্ভপাতের পর কেমন খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা উচিত?
গর্ভপাতের পর একটি পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। লোহা (Iron), প্রোটিন এবং ভিটামিন সমৃদ্ধ খাবার—যেমন সবুজ শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, দুধ এবং দই—শরীরে শক্তি যোগায়। পর্যাপ্ত পরিমাণে জল পান করাও অপরিহার্য।
অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার, জাঙ্ক ফুড এবং অতিরিক্ত ঝাল বা মশলাদার খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। অ্যালকোহল বা মদ্যপান এবং ধূমপান সম্পূর্ণভাবে বর্জন করা প্রয়োজন, কারণ এগুলো শারীরিক পুনরুদ্ধারের পথে বাধা সৃষ্টি করে। অতিরিক্ত পরিমাণে ক্যাফেইন গ্রহণ করাও শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। হালকা ও সময়মতো খাবার গ্রহণ করলে শরীর দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতে সহায়তা পায়।
আরও পড়ুন : চিয়া বীজ খাওয়া কাদের এড়িয়ে চলা উচিত? বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে জানুন
কোন কোন উপসর্গ দেখা দিলে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন?
গর্ভপাতের পর যদি আপনার অতিরিক্ত বা দীর্ঘস্থায়ী রক্তপাত, পেটে ক্রমাগত তীব্র ব্যথা, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব নিঃসরণ অথবা একটানা জ্বর দেখা দেয়, তবে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। মাথা ঘোরা, চরম শারীরিক দুর্বলতা, বমি হওয়া কিংবা অজ্ঞান হয়ে যাওয়াও গুরুতর সতর্কসংকেত হতে পারে।
ব্যথা যদি ক্রমশ বাড়তে থাকে অথবা ওষুধ সেবনের পরেও ব্যথা না কমে, তবে সেই বিষয়টিকেও উপেক্ষা করা উচিত নয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসকের দ্বারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করালে সংক্রমণ এবং অন্যান্য জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়।